Ebong Alap / এবং আলাপ
 

নজরে বিজ্ঞাপন : রান্নাঘরে কে – ‘হোমমেকার’ না কফিমেকার?

(November 4, 2018)
 

সংসার সুখের হয় ‘gadget’ এর গুণে - আজকের দুনিয়ায় এ আর অজানা কিছু নয়। তাই আধুনিক সময়ে যাবতীয় সাংসারিক গ্যাজেট তথা প্রোডাক্ট এর সঙ্গে অলিখিত নিয়মে জুড়ে গেছেন সংসারসুখের চাবিকাঠি – রমণীরা। প্রথম যুগের ওয়াশিং মেশিন থেকে ইস্তিরির বিজ্ঞাপনের কথাই ভাবুন, আধুনিক সংসারের মুশকিল-আসান হয়ে যা যা এসেছে – সেই সব কিছুর আদর্শ ক্রেতা মহিলারা। কারণ গেরস্থালির সুবিধার্থে যাকিছু ‘প্রোডাক্ট’ তা তো মহিলাদের প্রতিই ক্যাপিটালিস্ট অনুকম্পা!

কিন্তু কয়েক দশকে এই আদর্শ ক্রেতাটির চরিত্র বদলেছে - ৬০-এর দশকের ম্যাগাজিনের সাদাকালো বিজ্ঞাপনে বুফোঁ খোঁপার মহিলাটি এখন জিন্স-কুর্তা-ল্যাপটপ নিয়ে বেরিয়ে এসেছে বাড়ি থেকে। তবে কিনা পুরুষতান্ত্রিক সমাজের লক্ষ্মণরেখা তো পেরোনো মুশকিল। তাই ডাটার গুঁড়ো মশলা থেকে বাটার চটি, হারপিক থেকে হীরের গয়না - আধুনিকা ক্রেতাও এই গন্ডীতেই আটকা পরে থাকে। যেমন এমটিআর এই সাউথ ইন্ডিয়ান ব্রেকফাস্ট মিক্স-এর বিজ্ঞাপনটি –

ঘরের ঘরণী আধুনিকা। বাড়িতেও সচ্ছলতার বাড়বাড়ন্ত। কিন্তু নিয়মকানুন একই। ঘুমন্ত স্বামীকে হাসিমুখে ‘ব্রেকফাস্ট মে কেয়া লোগে’ জিজ্ঞেস করা দিয়ে দিনের শুরু। তারপর একে একে সন্তান-সন্ততি ও আত্মীয়বর্গের আদুরে আদেশ – কেউ ধোসা, কেউ ইডলি, বড়া বা উপমা। মোটামুটি দক্ষিণী ব্রেকফাস্টে যা যা থাকতে পারে, প্রায় কোনটাই বাদ নেই। আর তারপর হুকুম তামিল করার পালা। এখানেই বিজ্ঞাপনে নাটকীয় মোড় – দুই হাতের মানবী এমটিআর এর দয়ায় হয়ে ওঠেন দশভুজা। নিমেষে একের পর এক ফরমায়েশ তৈরি করে টেবিলে সাজিয়ে ফেলেন। খেতে বসে স্বামীটির বোধোদয় এবং তারপরে আলগা প্রশংসার চাউনি – যথেষ্ট। বউমার মুখে তৃপ্তির হাসি। তবে তৃপ্তিটা রান্নার শৈলীর নাকি কর্তব্য পালনের, তা বলা মুশকিল!

এই পড়ে পাওয়া চৌদ্দ আনা প্রশংসার পরেই আবার কাজের পালা শুরু – হাসিমুখে টেবিল গোছানোরত এরকম বউমার ছবি ফিরে ফিরে আসে হেল্দি টেস্টি তেলের বিজ্ঞাপনে। পরিবারের সকলের স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতন আধুনিকা সাধারণ রান্নার তেলের বদলে লুচি ভাজেন ওমেগা-থ্রি ওয়ালা তেলে। তেল বদল হয়, কিন্তু সংসারের ঘানি টানার কর্তব্য বদলায় না। রেডিমেড সানরাইজ সরষে গুঁড়ো, আধুনিক ব্লেন্ডার বা চুটকিতে মুসকিল আসান মাইক্রোওয়েভ – গ্যাজেট বা প্রোডাক্ট যাইই হোক, ব্যবহার করেন মা কিম্বা বউ কিম্বা মেয়ে অথবা খুউউউব বেশি হলে বাড়ির কাজের মেয়েটি। কিন্তু রান্নাঘরের চৌকাঠ ডিঙিয়ে পুরুষদের ঢুকতে দেখা যায় না। তবেই না দু’হাতের মানুষকে দশহাতের দেবী বনে যেতে হয় - বাথরুম পরিষ্কার থেকে ইটালিয়ান কুইসিন, ছেলের জন্মদিন থেকে অফিসের ডেডলাইন - সব সামলে দেবেন বলেই তো তিনি অনন্যা!

সংসার আর রান্নাঘর কেন্দ্রিক মেয়েদের এই নিয়মমাফিক ছবিটা কিছুটা হলেও বদলে দিয়েছে হাভেলস কিচেন এপ্লায়েন্স এর বিজ্ঞাপনটি।

প্রবাসী ছেলের জন্য মেয়ে দেখতে এসেছেন ছেলের মা। বিদেশ বিভুঁই-এ বউমাবিহীন সংসারে ছেলের কিরকম দুর্দশা তাই বলছেন - "এক কাপ গরম কফি কে লিয়ে ভি বাহার যানা পরতা হ্যায়..."। তাই ‘সেটল হওয়া’ তথা সংসারের-কাজ-করার-লোক নিয়ে যাওয়ার উপদেশ মায়ের। যে মেয়েকে দেখতে এসেছেন, সে জিনস-টপ-হিপ-হপ নয়, শালোয়ার-কামিজ-খোলাচুল-বিন্দি নিয়ে একেবারে ‘সংস্কারী’। ছেলের মায়ের কথা বেশ মন দিয়েই শোনে সে, তারপর মুচকি হেসে উঠে যায়। মেয়েটি টেবিলে এনে রাখে কফি মেকার- "টোয়েণ্টি ফোর আওয়ারস কফি মেকার। ইসিকে সাথ সেটল হো যাইয়ে”। তাছাড়া ভিসার ঝামেলাও নেই – মেয়েটির বুদ্ধিদীপ্ত সংযোজন। থতমত খেয়ে যান বলিয়ে-কইয়ে মা, ছেলে মুখ নীচু করে। "আন্টি, আমি কোন কিচেন এপ্লায়েন্স নই"- হতবাক হবু-শাশুড়ীর সামনে কফিমেকার রেখে বিজ্ঞাপনের ফ্রেম থেকে থেকে বেরিয়ে যায় মেয়েটি; কে জানে, হয়তো বেরিয়ে পরে ‘হোমমেকার’ এর চাপিয়ে দেওয়া কর্তব্যবোধ থেকেও!

 

Share

 

 

এখন আলাপ’ এ প্রকাশিত লেখাগুলির পুনঃপ্রকাশ বা যেকোনো রকম ব্যবহার (বাণিজ্যিক/অবাণিজ্যিক) অনুমতি সাপেক্ষ এবং নতুন প্রকাশের ক্ষেত্রে ‘এখন আলাপ’ এর প্রতি ঋণস্বীকার বাঞ্ছনীয়। এই ব্লগে প্রকাশিত কোনো লেখা পুনঃপ্রকাশে আগ্রহী হলে আমাদের ইমেল-এ লিখে জানান ebongalap@gmail.com ঠিকানায়।
আমরা আপনাদের মতামতকে স্বাগত জানাই। আমাদের সম্পাদকীয় নীতি অনুযায়ী মতামত প্রকাশিত হবে।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>

 


 
 

Ekhon Alap | এখন আলাপ

 

লিঙ্গ আর ধর্মের দূরত্ব ঘুচিয়ে 'আলাপ মিলাপ'

Share

গমগম করছে স্কুলপ্রাঙ্গণ। শামিয়ানা টাঙানো, মাটিতে শতরঞ্চি পাতা। অঞ্চলের মানুষজন বসে আছেন, নিজেদের মধ্যে আলাপচারিতা চলেছে। মহিলারাই সংখ্যায় বেশি। একটু বসি তাঁদের কাছে। পান খাওয়া হচ্ছে ভাগাভাগি করে। স্বনির্ভর গোষ্ঠীর বহু মহিলা এসেছেন। দুঁদে সংগঠক তাঁদের অনেকেই। অল্প সময়েই দূরত্ব মুছে যায়, আমি জানতে চাই তাঁদের কাজকম্ম-ঘরকন্নার কথা, তাঁরাও আমার খবর নেন।… ইতিমধ্যে মঞ্চে অনুষ্ঠান শুরু হয়ে গেছে। ‘দিশা’ আর ‘এবং আলাপ’-এর সদস্যরা বলছিলেন নিজেদের অভিজ্ঞতার কথা, এই অনন্য আলাপ মিলাপ কর্মসূচি-র জন্ম আর যাত্রার কথা। ভাটির দেশের মানুষেরা জানেন কান্ডারি দড় না হলে খাল-বিল-নদী-নালা-র দেশে ঘোর বিপদ। আগামীর কান্ডারি তো এই কিশোর কিশোরীরা। তাই জীবনের উজান ঠেলার জন্য তাদের তৈরি করতে হবে। হাত লাগাতে হবে সবাইকে। এলাকার চারটে স্কুলের ছাত্রছাত্রী, শিক্ষাকর্মী এবং দিশার সদস্যরা এক জায়গায় এলেন। পাশে ছিল ‘এবং আলাপ’। নানান বিষয়ে আলাপ আলোচনা আদান প্রদান শুরু হল, জাতপাত ধর্ম লিঙ্গ ভিত্তিক বৈষম্যকে প্রশ্ন করার পর্ব শুরু হল।

Share

more | আরো দেখুন

 
 
 
Subscribe for updates | আপডেটের জন্য সাবস্ক্রাইব করুন


158/2A, Prince Anwar Shah Road (Ground Floor)
Kolkata - 700045
West Bengal, INDIA

contact@ebongalap.org

+91 858 287 4273

Share
 
 
 

ekhon-alap

জেন্ডার বিষয়ে এবং আলাপ-এর ব্লগ 'এখন আলাপ'। পড়ুন, শেয়ার করুন। জমে উঠুক আড্ডা, তর্ক, আলাপ।

এখন আলাপ

'এখন আলাপ' এর পোস্টগুলির হোয়াটস্যাপ এ আপডেট পেতে আপনার ফোন নম্বর নথিভুক্ত করুন

:

Share