• চিনিকাকীদের অলীক আলাপচারিতা


    3    253

    December 21, 2019

     

     

    মেহরানগড়ের ফটকের ঢালু হয়ে গড়িয়ে যাওয়া ওপাশটা দেখি আর উলুঝুলু তাকাই দেওয়ালের দিকে — কারণ ওখানে একটি দু’টি নয়, একেবারে ত্রিশটি সতীরাণীর হাতের ছাপ। স্বামীর সঙ্গে সহমরণের চিতেয় উঠবার আগে তারা কাদামাটিতে ডানহাতটি চেপে রাখে। মরুভূমির জ্বালাধরানো রোদে শুকিয়ে নিমেষে খটখটে হলে সে ছাপকে ঢালাই করা হয় চুন সুরকিতে। পাথরের দেওয়ালে টাঙিয়ে রাখা হয়, ‘জয় সতীমাইয়া’ বলে হাঁক দেবার লোকের অভাব যেন কোনোদিনও না হয়! এই যেমন এখনো বাতাসে দোল খাচ্ছে একটি শ্রদ্ধাশীল মালা! 

    চিনিকাকী সেই কবে বলেছিল যদি বড় হয়ে সেখানে যাই কখনো, যেন ওই ঢালু রাস্তা দিয়ে গড়িয়ে গিয়ে জেনানা মহল, ঝরোখা সব দেখে শেষে মিউজিয়াম ঘুরে আসি। এই নির্দেশের গূঢ় অর্থ আছে। কারণ সে তো জানতোই, বুড়ি রাণীদের পরিণত হাতছাপের পাশে ওই ছোট, কিশোরীর মতো অপুষ্ট হাতগুলি আমার মনে প্রশ্ন জাগাবেই যে ছোট রাণীদের বয়স কতো ছিল? মিউজিয়ামের অন্ধকার কোণে সে আমার জন্য এ প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে রেখেছিলো। 

    চিনিকাকীর বাপের বাড়ি ছিল যোধপুর। সামনের দাঁতগুলি অল্প উঁচু, কোমর অব্দি চুল, ফর্সা টুকটুকে কাকীকে তার স্বামী, আমার পাড়াতুতো কাকা দুই কন্যাসহ ফেলে রেখে প্রেমিকার সঙ্গে চলে গেছিলো সোজা কলকাতা। পঞ্চাশ বছর আগে, মহাকাল পর্বত দেখা যায় এমন সাদাসিধে উত্তরবঙ্গীয় মফস্বল থেকে, কলকাতা তখন যোজনদূর। কেলেঙ্কারিটিও দারুণ মুখরোচক। সে আর ফিরবে না জেনেও কাকী সিঁদুর-টিদুর সবই পরতো, শুধু কখনো শিবুকাকার কথা আলোচনায় আনতো না, আর বাবার বাড়ির কথা। থেকে থাকবে কিছু ঝামেলা আর অসহায়তা, নাহলে স্বামী কেটে পড়লেও মেয়েরা শ্বশুরবাড়ি থেকে যায় কমই। থাকতে দেওয়া হলে তো! 

    আমি তখন এত ছোট, এসব অত বুঝি না, কিন্তু কাকীকে বেজায় ভালো লাগে। এত ঝামেলা আর চাপা উত্তেজনার মধ্যেও কাকী দুখখু দুখখু মুখ ক'রে বসে থাকেনা, লেখাপড়া জানে, আমার সব প্রশ্নের উত্তর দেবার চেষ্টা করে এমনভাবে যেন আরো প্রশ্ন জাগে মনের মধ্যে। অথচ অল্পবয়সী খুড়তুতো পিসিকে বেফাঁস জিজ্ঞাসা করেছিলাম বিয়ে কেন হয়, তাইতে সে চোখ মটকে, ফিচেল হেসে বন্ধুনীকে খোঁচা দিয়ে বললে — শোন রে, এইটুকু মেয়ে কী জিজ্ঞাসা করছে! এটা পেকে একেবারে ভ্যাদভ্যাদে কাঁঠাল হয়ে গেছে। দাঁড়া বৌদিকে বলে দেব। যা এখন পড়তে বোস। সারাক্ষণ আমাদের পিছু পিছু ঘোরা! 

    কাকী কক্ষনও এরকম বলতো না। বুঝি না বুঝি, বিয়ে কেন হয় প্রশ্নের উত্তরে সেইই প্রথম বলেছিল ভালবাসার কথা। ভালবাসলে বিয়ে হয় বা বিয়ে হলে ভালবাসতে হয়। যে বিয়েগুলো ভালবাসা নয় সেগুলো ভেঙে যায়। ঠিক বেঠিকের কথা তখন মনে আসবার সময় নয়। বরং সেই সূত্র ধরে কী ক’রে যেন তারপর ঈশ্বরচন্দ্র এসেছিলেন আমাদের কথোপকথনে, আর সতীদাহ। মেহেরানগড় অনেক আগে স্কুল থেকে দেখতে গেছিল চিনিকাকী, চোখ ভরে নিয়ে এসেছে অপরিণত কিশোরীর হাতের ছাপ। আমার কাঁচা চোখে অদেখা সেই মেয়েলি হাতছাপ চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ক'রে নিলে পর গুনগুনিয়ে উঠবেই জিজ্ঞাসা, তারা কি স্বেচ্ছায় চিতেয় উঠেছিল?  

    অথচ আমি এই প্রশ্নটা করিনি, কারণ উত্তরটা কাকী উচ্চারণ না করেই মনের মধ্যে চারিয়ে দিতে পেরেছিল। কিন্তু কেন কে জানে, অনেকদিন অব্দি কল্পনার চোখে যে কিশোরীকে চিতেকাঠে জ্বলতে দেখতুম তার সামনের দাঁতগুলি সামান্য উঁচু। 

    গেলাম অস্ত্রশস্ত্রের ঝনাতকার পার হয়ে মেহেরানগড় মিউজিয়ামের ছবি রাখার অংশটুকুতে। কাকী যেন পাশেই ছিল। যেন ছোটবেলায় শোনা তার উত্তেজিত কিন্তু সংযত কন্ঠ বলছিল,

    — দ্যাখ দ্যাখ, এই ছবিটা। মহাকায়, ভুঁড়িদার মহারাণা সিংহাসনে উপবিষ্ট। মাথায় উষ্ণীষ, কতো অলঙ্কার, আর কী বিশাল গোঁফ — ফুলো ফুলো গালের ওপর দিয়ে কান অব্দি চলে গেছে বাঁকিয়ে বাঁকিয়ে।আর ওই দ্যাখ তার বাঁ জানুর ওপর বসিয়ে রাখা পাখির মতো হালকা বিষণ্ণ একটি শিশুমেয়ে। খোলা চুল, কান অব্দি টানা চোখ, সদ্য উদ্ভিন্ন বুকের ওপর স্বচ্ছ ওড়নার রেখা। মুখে হাসি নেই একটুও। এতো বিষাদ, যেন মরুভূমির রাত্রি নেমে এসেছে মুখের প্রতিটি রেখায়। কেন বল তো?” 

    আমি ছোট্টটি হয়ে যাই আবার। অজস্র দর্শনার্থীদের ভিড়ে কেউ আমার ফিসফিসানি শুনতে পায়না। শুধোই,

    — কেন কাকী?

    — তখনকার রাজা-রাজড়ারা নিজের রাজ্যের ভেতরে যে মেয়েকে ইচ্ছে তুলে নিয়ে এসে বিয়ে করত বা বিয়ে না করেই প্রাসাদে আটকে রাখতো। যেন জ্যান্ত খেলনা! হয়তো এই মেয়েটি কোনো কিষাণের মেয়ে, লুকোচুরি খেলছিল জোয়ারের খেতে। সূর্যাস্তের আলো পড়ে ঝলমল করছিলো তার মসৃণ ত্বক, বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে উঠছিলো তিলফুল জিনি নাসা, তার নাকের ডগায়। হঠাৎ ঘোড়ার পিঠে রাজছত্রের নীচে স্থূল বয়স্ক রাণার চোখে পড়ে গেল তার হরিণী চলন আর সব ঢেকে দেওয়া মরুঝড়ের মতো আচ্ছন্ন করা রূপ। ব্যস! রাজাদেশে সেপাইরা তাকে তুলে নিয়ে এলো এই দুর্গে — যেখানে আকাশ দেখা যায় শুধু ঝরোখার ফাঁকে। 

    ওর মুখে বিষাদ থাকবে না তো কার মুখে থাকবে বল! হয়ত বা যেদিন আবার বেরোতে পারলো, সেদিনটা ঐ চিতেয় ওঠার দিন! 

    কাকী নিজের জীবনে বুঝেছিল পরিত্যক্ত খেলনা হয়ে যেতে কেমন অপমান আর বিষাদ, তাই বোধহয় বলার সময় আওয়াজ নীচু থাকলেও তার গালদুটো লালচে হয়ে যেতো, চোখ গনগনে। 

     

    টুকুনদিদি মায়ের শাঁখাপরা হাত চেপে ধরতো, মা আর না। আমার দিকে ফিরে বলত, নিজের বাড়িতে যা। সবসময় আমার মায়ের পেছন পেছন ঘুরিস কেন রে!

    আমার পেছন পেছন ঘোরার একটা ইতিহাস আছে তাহলে। শুধু বড় হবার কৌতূহল নয়, যারা জীবনকে ইতিহাসের সঙ্গে মিলিয়ে দিতে পারত, প্রকৃতির সঙ্গে মানুষকে, তাদেরকে বড় অনুসরণযোগ্য মনে হত আমার। কাকী বাগান করতে ভালোবাসত খুব। একদিন টমেটো গাছের গোড়ায় সার দিচ্ছে, আমি হাতের কাছে খুরপি, জলের মগ এগিয়ে দিচ্ছি। কাকী হঠাৎ বললো, টমেটো গাছ পুঁততে হয় গভীর গর্তে। আমি ভাবলাম লতানে গাছ বলে এই নিদান। কাকী বললে, না, এই যে দেখছিস ওর গায়ে সরু সাদা অজস্র রোঁয়া, ওগুলো মাটির ছোঁয়া পেলে সব শেকড় হয়ে যাবে। একটা বুড়ো টমেটো গাছ কখনো হাতে তুলে দেখবি কতটা জায়গা জুড়ে ছড়িয়ে থাকে ওর শেকড়বাকড়। ওরা মানুষের মতো। শেকড় আর সম্পর্ক ছড়ানোর জন্য সবসময় বড় জায়গা, বড় মন চাই। তবে হ্যাঁ, দুটোই তুলতে বা ভাঙতে বড় কষ্ট। 

    কষ্টের কথা বললেও তার মুখে হাসির আভাস মিলিয়ে যেত কমই। পলাতক মুক্তিযোদ্ধাদের আস্তানা হয়ে উঠছিল একাত্তরের সেই শান্ত মফস্বল, আর কাকী হলো তাদের সমর্থক ও খাবার-যুগিয়ে। দজ্জাল শাশুড়ির চোখের আড়ালে কী করে যে সে এই কাজগুলো ক'রে যেত — ততদিনে লম্বায় কাকীর কাঁধসমান হয়ে গেলেও তা আমার বোঝার অতীত ছিল। কাকী বলত নিজের দেশ, ভিটেমাটির জন্য যারা লড়াই করে তারা সব হিরো। যেদিন বাংলাদেশ স্বাধীন হল, আমাদের সীমান্তশহর থেকে আহত মুক্তিযোদ্ধারা ব্যান্ডেজ বাঁধা হাত পা নিয়েই দৌড়ল ‘দ্যাশ’-এর দিকে। কাকীকে মানুষউঁচু পাটক্ষেতের ভেতর হাঁটু ছুঁয়ে প্রণাম আর কদমবুসি করে গেল পিন্টু নস্কর, আলম শেখ।

    কিন্তু মানুষ কাকীকে ছাড়েনি। কারা যেন রটিয়ে দেয় বিশ্বাসবাড়ির স্বামীপরিত্যক্তা বৌটি এক মুসলমান মুক্তিযোদ্ধার প্রেমে পড়ে তাকে খাইয়েছে, আশ্রয় দিয়েছে, যাবার সময় পথখরচা বাবদ হাতের নোয়া খুলে দিয়েছে। শেষেরটা তো মহাপাপ! কারণ স্বামী অন্য মেয়েকে নিয়ে যতই ফষ্টিনষ্টি করুক না কেন, এয়োতির নোয়া আর আনুগত্য তো অক্ষয় ভূষণ! কাকীর ছায়াসঙ্গিনী আমি তো জানি খুব ভালো করেই এসব অতি ফালতু কথা। জল তুলে জালা ভর্তি ক'রে রাখবার সময় বালতির মোটা দড়িতে ঘসা লেগে কাকীর হাত থেকে নোয়া খুলে কুয়োর গভীর জলে পড়ে যায়। কাকী সেকথা বলতেই পারতো, কেন বলেনি কে জানে! হয়ত শিবুকাকুর প্রসঙ্গ নতুন করে ফিরে আসা সে পছন্দ করেনি। কিম্বা উষ্ণতাহীন, দরদহীন এক লৌহ-অলঙ্কারের ফরম্যালিটি তার আর সইছিল না। 

    এরপর কিছুদিন কাকী খুব আনমনা থাকতো। সবাই ঘুমোলে বাড়ির পেছনে রেললাইন, তার ওপাশে ধানখেতের আলে বসে আমরা কতো নির্জন দুপুর কাটিয়েছি। এইরকমই এক ঘুঘুডাকা দুপুরে, বেলা একটা-দেড়টা হবে, ঘেমো গরম পড়েছে, আমি উঠে আসবার জন্য উসখুস করছি, ঠিক এইসময় চারপাশে একটা কী যেন ঘটতে লাগলো। একটা অচেনা বাতাস অনেকক্ষণ থেকে কাকীর কপালের ওপরের চূর্ণকুন্তল নিয়ে খেলে যাচ্ছিল। হঠাৎ তার দমক বেড়ে গেল। সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পুরো ধানখেতের মাথা নাড়ানো। অদ্ভুত একটা সড়সড় শব্দ সামনে পেছনে পাশে দূরে। কাকী আমার হাত শক্ত ক'রে ধরে বলল, চুপ করে বোস। সেদিন জিজ্ঞাসা করেছিলি পরাগমিলন কী ভাবে হয়। সেজন্যেই ক'দিন হলো তোকে নিয়ে এখানে আসি। আজ দেখে নে, আর কোনদিন ভুলবি না। 

    দেখি এক একটি ধানগাছের শীর্ষ থেকে গোড়া অব্দি থরে থরে সাজানো প্রত্যেকটি নৌকাকৃতি ধানের দানা দুভাগে খুলে গেছে। প্রত্যেকটির ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে ঝুলছে, বাইরে দুলছে, দোল খাচ্ছে ডাঁটিসহ একাধিক সাদা ধানফুল। হাওয়ায় উথাল-পাথাল দুলছে নিষিক্ত হতে চাওয়া সেই অজস্র জেদি সাদা ভ্রুণ। কাকী বললো, আর যেন কল্পনাতেও দেখতে পেলাম, ভেতরের পরাগথলি থেকে মিহি পরাগের গুঁড়ো আশির্বাদের মতো নেমে আসছে তাদের ঢেকে দিতে।  

    কতোক্ষণ এই অলৌকিক দৃশ্যের সাক্ষী ছিলাম কে জানে, দশ মিনিট না আধ ঘন্টা, ঘোর কাটতে দেখি ভাগ হয়ে যাওয়া সব ধান জুড়ে গেছে। হাওয়া পড়ে গেছে। নিষিক্ত ভ্রুণ গর্ভে নিয়ে শান্ত হয়ে গেছে সব গাছ। এবার শুধু সন্তানদের পুষ্ট করে তোলবার পালা। 

    ধানগাছ যদিও স্বয়ংসম্পূর্ণ উদ্ভিদ — তার পরাগথলি, পরাগমিলন, ভ্রুণ সবই ঐ নৌকাকৃতি দানার শরীরের নিজস্ব ঘেরে, তবু সেইদিন চিনিকাকীর কল্যাণে সৃষ্টিরহস্যের অনেকটাই আমার অপরিণত মস্তিষ্কে ধরা দিয়েছিল। ক্লাস সেভেনের সিলেবাসে পরাগমিলন বা আরো উঁচু ক্লাসে মানুষের জন্মরহস্য আর আমাকে বিব্রত করতে পারেনি।

    গত জুন মাসে মা চলে যাবার পর অদ্ভূত বিষণ্ণতা মাঝে মাঝে কপ ক'রে গিলে ফেলছে আমাকে। মায়ের প্রাণসখী ছিল চিনিকাকী। এ ওর চুল বেঁধে দেওয়া, আলতা পরানো, সিঁদুরখেলা। কাকী যেতে চাইতো না। মা জোর ক'রে টেনে নিয়ে যেতো। একসঙ্গে খবরের কাগজ পড়তো, হালকা রাজনৈতিক আলোচনা করতো। মাঝেসাঝে কাছের সিনেমাহল। চিনিকাকী বেঁচে আছে না মরে গেছে জানি না। পিসিরা কেউ আছে, কেউ গেছে। তবু ইদানীং ঘর একা হয়ে গেলে সন্ধ্যার ছায়ায় এরা সবাই এসে আমার খাটের ওপর বসে। নিজেদের মধ্যে গল্প করে, আমার বোকামি নিয়ে দেদার হাসাহাসি চলে। জীবনের পাঠ নিতে এত ভুল আমার হলো কী ক'রে এই তাদের বিস্ময়। দিশা-নির্ভয়া-উন্নাও সব খবর তারা রাখে। হতাশায় নীচের ঠোঁট উল্টায়, যেন কী পাল্টালো এতদিনে এই তাদের জিজ্ঞাসা। এদের মধ্যে মা আমার প্রাণ আর চিনিকাকী আমার বন্ধু-ফিলোজফার-গাইড। সে তো একদিন যেন দেশভাগ, ক্যাব, এনআরসি নিয়েও কিছু বলাবলি করছিল মনে হল। মুশকিল হচ্ছে কান ক'রে এদের কথা শুনতে গেলে সব জড়িয়েমড়িয়ে একাকার হয়ে দূর থেকে ভেসে আসতে থাকে অজস্র ধানের পরাগ ঝরানোর শব্দ। ক্রমশ সেটা পরিণত হয় একনাগাড়ে আগ্নেয়াস্ত্র চালাবার ভয়ংকর নিষ্ঠুর একঘেয়ে শব্দে। মানুষ ভেসে যাচ্ছে, চারপাশ পুড়ছে, তবু এই দাহে প্রলেপ দেবার কেউ নেই।       

    আমি তাই আর কিছু শোনার চেষ্টা করিনা। শুধু হালছাড়া ভিখিরির মতো এক পাশে বসে থাকি। যা শিখেছি সব ভুলিয়ে দিচ্ছে এই আগুনে সময়। তাই প্রাণপণে চাইতে থাকি দীর্ঘতর হোক অগ্রজাদের অশ্রুত আলাপচারিতা, মূল্যবোধের ধাত্রীদের এই অলীক উপস্থিতি।

    এই চলে, যতক্ষণ না কাজকর্ম শেষে ফিরে আসে বাড়ির অন্য লোকেরা আর তাদের আঙুলচাপা কলিং বেলের আর্তস্বরে অন্ধকার ঘর ভরে ওঠে।

    গোপা সব শুনেটুনে চিন্তিত হয়ে পড়ল — চল দিদি, তোমাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাই। মাসিমা চলে যাবার পর থেকেই তুমি কেমন পালটে যাচ্ছ। 

    ডাক্তারের চেম্বার হয়ে ওষুধের দোকান। সেখান থেকে ফিরে এখন নেক্সিটো-৫ এর পাতা হাতে অন্যমনস্ক হয়ে বসে আছি অনেকক্ষণ। বুঝতে পারি না, এই ওষুধের কারণে যদি চিনিকাকী দূরের মানুষ হয়ে যায়, বন্ধ হয়ে যায় পূর্বজাদের অবাধ অলীক আনাগোনা, আমার ভালো লাগবে তো!

     

     
     



    Tags
     



    Comments (3)
    • অনবদ্য লেখা। সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নারীদের মনের উপর কিভাবে প্রভাব ফেলে তার একটি প্রাঞ্জল নিদর্শন।

    • অসাধারন! মন শুধু ভরেই গেল না, খানিকটা ফাঁকাও হয়ে গেল। ব্যক্তিগত আর সমষ্টিগত মিলে গেছে কোনও কোনও বিন্দুতে, আশ্চর্য সহজতায়। ধন্যবাদ প্রতিভা!

    • নস্টালজিয়া জড়ান মন-কেমন-করা লেখা। এমন চিনিকাকীদের আমরা চিনি। সারাজীবন অপ্রাপ্তি থেকে যায়, ইস্পাতকঠিন পুরুষতান্ত্রিক সামাজিক বাঁধন আজও আলগা হয়নি। “স্বামী অন্য মেয়েকে নিয়ে যতই ফষ্টিনষ্টি করুক না কেন, এয়োতির নোয়া আর আনুগত্য তো অক্ষয় ভূষণ!” সেই সতীরাণীরা আজও হাহাকারের ছাপ রেখে যায়।

      ইতিহাসের পথে অনেকটা দূর নিয়ে গেলেন, একটা ভাল-লাগা আর সেই সঙ্গে মন-খারাপ অম্লমধুর ভাব রয়ে গেল। ধন্যবাদ এই অসাধারণ লেখাটির জন্য।

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>

     



    তথ্য নীতি | Privacy policy

 
Website © and ® by Ebong Alap / এবং আলাপ, 2013-24 | PRIVACY POLICY
Web design & development: Pixel Poetics