• বন্ধুরা: একটি চিত্রনাট্য


    0    100

    December 30, 2019

     

    (উপলক্ষ্য)

    এয়ারলাইনস-এর সার্ভার ডাউন ছিল৷ বম্বের ফ্লাইট তিন ঘন্টা পিছোতে পারে৷ অনন্যা কিন্তু খবরটা শুনে মুষড়ে পড়ল না৷ বিরক্তও না৷ দার্শনিক ভঙ্গিতে সে বিজনেস ক্লাস লাউঞ্জে ঢুকল৷ সোফায় বসতে বসতে স্মিত হাসি উপহার দিল ভিড় করে থাকা এয়ারলাইনস স্টাফদের৷ এই সময়েই সেলফি-র অনুরোধ আসে৷ দু’ আনা কঠোরতা আর চৌদ্দ আনা মিঠে হাসি মিশিয়ে সে “নো সেলফি প্লিজ” বলে মোবাইলে মন দিল৷

    আর ঠিক তখনই ঈষৎ পৃথুলা বসুধা ঢুকল কাউকে একটা বকতে বকতে৷ ঘাড় তুলে অনন্যা দেখল বসুধা ফোনে কাউকে ধমকাচ্ছে৷ শাড়িতে স্মার্ট লাগছে বসুধাকে৷ সাদায়-কালোয় চুলটা ভাল পার্লারে কাটানো বোঝা যায়৷ কলেজের অধ্যাপকরা আজকাল ফ্যাশনেবল হয়েছে! অনন্যা মুচকি হেসে চোখ নামিয়ে নেয়৷ দ্যাখা যাক অনন্যাকে চিনতে পারে কিনা বসুধা৷

     

    (Sc I / Indoor / Airport Louage / Day)

     

    বসুধা: ওকে! কী হয়রানি বলুন তো৷ Server down! How terrible, সব plan চৌপাট৷

    কথাগুলো এয়ারলাইন স্টাফদের দিকে তাকিয়ে বলা৷ তারা পেশাদারী ভঙ্গিতে আলতো হাসি ছুঁড়ল৷ মুখে কিছু বলল না৷ লাউঞ্জে ইতস্তত ছড়ানো আরো লোকজন, তারা সবাই অনন্যাকেই দেখছে, অনন্যা এবার সানগ্লাসটা মাথার উপর তুলে নেয়৷

    অনন্যা: Cigarette ধরলি কবে?

    বসুধা অনন্যার দিকে তাকায়। এক মুহূর্ত৷ উঠে দাঁড়ায়৷

    বসুধা: তুই! তুই! You!

    অনন্যাও উঠে দাঁড়ায়৷ এগিয়ে এসে বসুধাকে আলিঙ্গন করে৷

    বসুধা: আমি তো কথা বলতে পারছি না রে৷ Film star-এর সঙ্গে আলিঙ্গন! কী কাণ্ড! তুই আমাকে চিনতেই বা পারলি কী করে? আমার তো পঞ্চাশ কেজি ওজন বেড়েছে৷ ওরেত্তারা! কী কাণ্ড!

    অনন্যা: কী কাণ্ড দু’বার বলেছিস! তোকে চিনেছি, চিনতে চেয়েছি বলে৷ আমার secretary তোকে facebook-এ খুঁজে পেয়ে আমায় দেখিয়েছে৷ তোর নাড়ি-নক্ষত্র সব জানি আমি!

    বসুধা: কী কাণ্ড! এ তো surveillance রে!

    অনন্যা: এটা democracy; surveillance শুধু স্টারদের হবে এ তো হয় না৷ এক তরফা আর কিছুই নেই৷ Internet এই প্রকৃত সাম্যবাদ৷

    দু’জন দু’জনের দিকে তাকিয়ে হাসতে থাকে৷ বাকিরা সবাই ওদেরই দেখছে৷

    Cut to

     

    (Sc II / Indoor / Airport Lounge / Day)

     

    [বলাই বাহুল্য, অনন্যা আর বসুধা ছোটবেলার বন্ধু৷ একসঙ্গে মফসসলের স্কুল৷ অনন্যা স্কুল শেষ করে সুপ্রতিম নামের একটি আধা-বখাটে ছেলের সঙ্গে পালিয়ে যায়৷ পরে তাকে নতুন ভাবে আবিষ্কার করা যায় হিন্দি সিনেমার গরম নায়িকা হিসেবে৷ ধীরে ধীরে সু-অভিনয় করার সুযোগ পেয়ে তার সদব্যবহার করে ইদানিং ‘লিট-ফেস্ট’-এ নারীর অধিকার, কাস্টিং কাউচ ইত্যাদি নিয়ে বক্তব্য রাখার ডাকও পাচ্ছে৷ পিচ্ছিল অতীতের অনেকটাই এখন বিস্মৃতির ধোঁয়ায় ঢাকা৷ সফল, সুন্দরী, আধা সেলিব্রিটি আধা এক্টিভিস্ট অনন্যাকে সারা দেশ চেনে এখন৷ শুধু নিতম্ব ও বক্ষ, ক্ষীণ কটি ও মোটা বুদ্ধি বলে ওকে দাগিয়ে দিলে সমাজ মেনে নেবে না৷ এই জন্যেই না বুদ্ধিমান মানুষ সফলতা চায়৷ Success takes care of all!

    বসুধা চিরকাল ভাল ছাত্রী৷ মধ্যবিত্ত পরিবারের নিয়ম মানা মেয়ে৷ কালে কালে বিদ্যা অর্জন করে কলেজের শিক্ষিকা৷ ছোট গণ্ডীতে যাপন৷ বড় স্বপ্ন দেখেছিল এক সময়৷ পরিব্রাজক হবে, আন্টার্টিকা যাবে — এইসব ভাবনা আজ “সরকার তো ডিএ দেয় না;” “এবার একটা বড় গাড়ি কিনতেই হবে, নয়ত মান থাকে না,” “বুবলাই-এর জয়েন্ট এর র‍্যাঙ্ক পাঁচশো’র মধ্যে হবে তো?” ইত্যাদি প্রশ্নেই দিন যায়, রাত যায়৷ কমোডে বসে নিজের মনে তলিয়ে যেতে যেতে কখনো মনে হয় সুখী, সুখীই তো, আবার রাতে চুল আঁচড়ানোর সময় থমকে গিয়ে ভাবে কোনও স্বপ্নই সফল হল না৷ চিরন্তন মধ্যবিত্ত দোলাচল!]

    বসুধা: একটা selfie তুলব কিনা ভাবছি৷ Me with film star! #ChildhoodFriend, #MeetingAfterAges …

    অনন্যা: তুই তো intellectual, তোর তো selfie, hashtag এগুলো নিয়ে critical হওয়ার কথা!

    বসুধা: Critical ই তো৷ অন্যের বেলায়!

    দুজনেই হাসে৷

    এবার অনন্যা বসুধার হাত ধরে৷

    অনন্যা: কেমন আছিস বসুধা-নি-সা!

    বসুধা: এই নামে ডাকতিস আমায়৷ মনে আছে তোর?

    অনন্যা: তোর মনে নেই?

    বসুধা: (Pause) নেই আবার! অতীতে ফিরতে চাই তো রোজ৷ তা অসম্ভব জেনেও ফিরতে চাই রে অন্যা!

    অনন্যা: কেন বসু? ফিরতে চাস কেন?

    বসুধা: স্বপ্নগুলো একটাও ছুঁতে পারলাম না, তাই! কলেজে পড়াই ব্যস! Intellect এর চর্চা ছাড়া সবের চর্চা আছে৷ পরিব্রাজক হতে চেয়েছিলাম, কী হলাম বল? Comfortable, আঁটোসাঁটো জীবনে সুখী হয়ে গেলাম!

    অনন্যা: (Pause) আমিও ফিরতে চাই জানিস?

    বসুধা: অতীতে?

    অনন্যা: হুম৷

    বসুধা: কেন? তুই ফিরতে চাস কেন? তুই তো সফল করেছিস তোর স্বপ্ন!

    অনন্যা: সেই জন্যই তো!

    বসুধা: মানে?

    অনন্যা: স্বপ্ন সফল হওয়া অভিশাপ, বুঝলি বসু?

    বসুধা: বলিস কী!

    অনন্যা: Of course! স্বপ্নগুলো ছুঁয়ে ফেললেই সেগুলোর সব রং পাঁশুটে হয়ে যায়৷ কী সাধারণ লাগে স্বপ্নগুলো! Mr. M এর সঙ্গে একদিন coffee খাব এই ছিল আমার number 1 dream! Mr. M এর সঙ্গে সত্যিই যেদিন coffee খেলাম, সেদিন বুঝলাম লোকটা কী Ordinary! Self obsessed! কী বোকা! কী ওপর চালাক! ওঃ!

    বসুধা: এইসব romantic ভাবনা, হয়ত তোকে মানায়৷ আমরা যারা স্বপ্ন ছুঁতে পারিনি তারা হা-পিত্যেশ করে মরি৷

    অনন্যা: বসুধা, তোকে একটা personal প্রশ্ন করছি৷ উত্তর দিবি তো?

    বসুধা: চেষ্টা করব৷ বল প্রশ্নটা৷

    অনন্যা: পরিব্রাজক না হয় হোসনি৷ কিন্তু তোর কি আর কোন স্বপ্নই এখন নেই? ধর, একটা গাড়ি, বা ইয়োরোপ ভ্রমণ বা whatever...

    বসুধা: হাঃ হাঃ৷ ভাল প্রশ্ন৷ এক্কেবারে ঠিক ধরেছিস৷ এখন সব স্বপ্নই ঐরকম গোদা, materialistic স্বপ্ন৷ এগুলো আছে বটে! আণ্টার্কটিকা নয়, এখন প্যারিস যাব ভাবলেই আনন্দ হয়!

    অনন্যা: তোর মনে হয় না, এই সব স্বপ্নগুলো আছে বলেই জীবন সুন্দর! এই স্বপ্নগুলো দেখাই আসলে জীবন!

    বসুধা: Of course, তো তাতে হলটা কী?

    অনন্যা: সব স্বপ্ন ছুঁয়ে ফেললে বাঁচার মজাটাই তো চলে যাবে রে!

    বসুধা: মানে কী দাঁড়ালো? আমি Europe থেকে ফিরে যখন দেখব আমার একটা স্বপ্ন ছুঁয়ে উঠতে পেরেছি, তখন আমার আর বাঁচতে ইচ্ছে করবে না? যাঃ এমনটা হয় নাকি?

    অনন্যা: আমি তোকে বোঝাতে পারছি না৷

    বসুধা: চেষ্টা কর৷ আমি শুনতে প্রস্তুত৷

    অনন্যা: (Pause) ধর, তোর এই Europe, গাড়ি বাড়ির স্বপ্ন, যেগুলো তুই অনায়াসেই ধরে ফেলতে পারিস বা চেষ্টা করলে পারবি, সেগুলো আপাতত সরিয়ে রাখলাম৷

    বসুধা: বেশ রাখলাম৷

    অনন্যা: এবার ধর এমন একটা স্বপ্ন যেটা তুই জানিস, এ জীবনে হয়ত সফল হবে না৷

    বসুধা: যেমন আমার পরিব্রাজক হওয়া৷

    অনন্যা: That’s right

    বসুধা: এই স্বপ্নটা নিয়েই তোর theory৷ তাই তো?

    অনন্যা: আওয়াজ মারিস না৷ মন দিয়ে শোন৷

    বসুধা: ছেলেবেলার বন্ধুকে আওয়াজ মারব৷ সে তুমি যতই star হও৷

    অনন্যা: আচ্ছা, সে মার৷ কিন্তু শোন মন দিয়ে৷

    বসুধা: শুনছি৷ বল৷

    অনন্যা: তুই সারাদিন কাজের ফাঁকে না হলেও রাতে, ঘুমোতে যাওয়ার আগে, একবার কি ভাবিস না, তোর পরিব্রাজক হওয়া হল না? অন্তত একবার? রোজ না হলেও মাঝে মাঝে?

    বসুধা: তা ভাবি!

    অনন্যা: সেটাই বলতে চাইছি৷ এবার তুই পরিব্রাজক হয়ে গেলে কী নিয়ে ভাবতিস বল তো ঘুমোতে যাওয়ার আগে?

    বসুধা: কী নিয়ে?

    অনন্যা: ভাবতিস, এই যে আমি এত বড় achiever, কই সরকার তো আমার পদ্মশ্রী দিল না? কাগজের front page এ আমার নাম দিয়েছে তো? সব কাগজে দিয়েছে, ঐ ব্যাটা দিল না কেন?

    বসুধা: তা, স্বপ্ন সফল হবে আর লোকে পিঠ চাপড়াবে, এমন আশা করব না?

    অনন্যা: ওখানেই গণ্ডগোল৷ তখন তোর স্বপ্ন সফলের আনন্দটা আর নিখাদ থাকবে না৷ এইসব by product নিয়ে বেশি ভাবতে থাকবি৷

    বসুধা: সেই জন্য স্বপ্ন সফল না হওয়াই ভাল?

    অনন্যা: শুধু সেই জন্যই না৷ আরো ব্যাপার আছে৷ গোলমেলে ব্যাপার৷

    বসুধা: কেমন?

    অনন্যা: যেমন ধর পরিব্রাজক হলি তুই৷ সত্যি সত্যিই সব ছেড়েছুড়ে নিজেকে খুঁজতে, বিশ্বকে বুঝতে রাস্তা ধরলি৷ তারপর?

    বসুধা: কী তারপর?

    অনন্যা: তুই স্বপ্নটা যখন দেখেছিলি তখন সেটা ছিল তোর ফ্যাণ্টাসি। রিয়েলিটি-র আলো বা অন্ধকার কিছুই ছোঁয়নি সে ফ্যাণ্টাসি। এবার সত্যি সত্যিই যখন রিয়েলিটি ছুঁল তোর সেই ফ্যাণ্টাসি তখন বুঝলি যা ভেবে উৎসুক ছিলি, উৎসাহিত ছিলি, আর যা সত্যি ঘটছে সে দুই এর মধ্যে ফারাক অনেক৷

    বসুধা: তুই হয়ত যা বলতে চাইছিস তা বুঝতে পারছি৷

    অনন্যা: কী বল তো?

    বসুধা: আমি বহু বাসনায় প্রাণপণে চাই, বঞ্চিত করে বাঁচালে মোরে!

    অনন্যা: এ কৃপা কঠোর সঞ্চিত মোর জীবনভরে!

    বসুধা: (Pause) Paradox Paradox গভীর Paradox!

    অনন্যা: কেন বলছিস?

    বসুধা: ‘না চাহিতে মোরে যা করেছ দান / আকাশ আলোক তনু মন প্রাণ’ লেখা লোকটাকে নোবেল দিল জগৎ সংসার! এটা paradox নয়?

    অনন্যা: (Pause) সব স্বপ্ন সফলতার পর্বে একটা মূল্য চোকানোর গল্প থাকে৷ স্বপ্ন ছুঁয়ে ফেলার পর মনে হতেই পারে, বড় বেশি মূল্য চোকালাম৷ তখন স্বপ্নটা খানিক বিস্বাদ লাগে... মনে হয় এই স্বপ্নই কি দেখেছিলাম আমি? এর চেয়ে আমার স্বপ্ন থাক আমার ফ্যাণ্টাসিতে!

    [এয়ারলাইনস স্টাফদের মধ্যে হাল্কা ব্যস্ততা দেখা যায়]

    অনন্যা: এদের চঞ্চলতা বোধহয় আমাদের জন্য সুখবর আনতে চলেছে৷ তা হাঁ রে, তুই যাচ্ছিস কোথায়?

    বসুধা: জব্বলপুর৷ তুই বম্বে?

    অনন্যা: না৷ গোয়া৷ একটা শুটিং আছে৷

    বসুধা: অদ্ভুত লাগছে৷ তোর সঙ্গে এমন আশ্চর্য পরিস্থিতিতে দেখা হল... আর বেশ অন্যরকম একটা বিষয় নিয়ে গালগল্প হল রে... বেশ লাগল৷

    অনন্যা: আমার phone number চাইবি না?

    বসুধা: কী দরকার? তুই ব্যস্ত মানুষ৷ এই হঠাৎ দেখার স্মৃতিই বরং সঙ্গে রাখব! তোর আর আমার জগৎ এত আলাদা! কিছুদিনের উচ্ছ্বাস সাঙ্গ হলে কথা ফুরিয়ে যাবে... নতুন কথা তৈরিও হবে না৷ এটাই ভাল৷ এই ছোট্ট আড্ডার স্মৃতি৷

    অনন্যা: যাক! Intellect এর চর্চা নেই বললি বটে৷ তবে সম্পূর্ণ ঢ্যাঁড়শ হয়ে যাসনি!

    দু’জন দু’জনের দিকে তাকিয়ে হাসি৷ বেদনা, স্নেহ আর ভালবাসা মেশানো যে চাহনীতে ফ্রিজ করে ফ্রেম।

     

     
     



    Tags
     


    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>

     



    তথ্য নীতি | Privacy policy

 
Website © and ® by Ebong Alap / এবং আলাপ, 2013-24 | PRIVACY POLICY
Web design & development: Pixel Poetics