Ebong Alap / এবং আলাপ
 

এক রোববারে পায়ে পায়ে মেটিয়াবুরজ

(January 26, 2018)
 

গত রবিবার ২১ জানুয়ারি, ২০১৮ অ্যাসোসিয়েশন স্ন্যাপ, এবং আলাপ ও অভিযান পাবলিশার্সের যৌথ উদ্যোগে পায়ে হেঁটে মেটিয়াবুরজের কিছু ঐতিহাসিক জায়গা ঘুরে দেখার কর্মসূচী নেওয়া হয়। বিগত প্রায় এক বছর ধরে ‘প্রতিবেশীকে চিনুন’ উদ্যোগের অংশ হিসাবে কলকাতা ও তার বাইরে একাধিক কর্মসূচী নেওয়া হয়েছে, এ ছিল তারই সর্বশেষ সংযোজন। খাতায়-কলমে কলকাতার অংশ হওয়া সত্ত্বেও অধিকাংশ শহরবাসীরই পা পড়ে না মেটিয়াবুরজে। জান্তে-অজান্তে অপর করে রাখা শহরের দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তই ছিল এককালে লখনউয়ের শেষ নবাব, নির্বাসিত শাসক ওয়াজিদ আলি শাহের শেষ জীবনের আবাসস্থল, যেখানে তিনি গড়ে তুলেছিলেন সাধের ‘ছোটা লখনউ’। প্রায়-বিস্মৃত ইতিহাসের পাতাগুলো চাক্ষুষ করা এবং অচেনা প্রতিবেশীকে চেনার শুরুয়াত—এই উদ্দেশ্যেই রবিবারের সকালের আলস্য কাটিয়ে বেরিয়ে পড়েছিলেন ৫৭ জন শহরবাসী। পায়ে পায়ে খুঁজে নেওয়া কলকাতার বুকে অগোচরে থেকে যাওয়া আরেক কলকাতাকে।

হেরিটেজ ওয়াক দিয়ে দিন শুরু হল। আমরা এসে পৌঁছলাম সাবেক ওয়াজিদ আলি শাহের পরিখানায়, যা বর্তমানে দক্ষিণ-পূর্ব রেলওয়ের জেনারেল ম্যানেজারের আবাসস্থল। আশেপাশে মাথা তুলেছে রেলকর্মীদের কোয়ার্টার, অফিসার্স ক্লাব ইত্যাদি। ফেলে আসা দিনের প্রায় কোনো চিহ্নই আর অবশিষ্ট না থাকলেও তার মধ্যে থেকেই বিভিন্ন উল্লেখযোগ্য অথচ অজানা তথ্য তুলে ধরলেন লেখক শামিম আহমেদ, এই ওয়াকের গাইড এবং ওয়াজিদ আলি শাহের জীবনকেন্দ্রিক উপন্যাস আখতারনামা-র লেখক। পরিখানা সংলগ্ন ঘাটে গিয়ে সকলেই কল্পনা করার চেষ্টা করলেন নির্বাসিত রাজার শেষ সম্বল এই জনপদের তখনকার ছবি।

পরিখানা থেকে আমরা পা বাড়ালাম বালু ঘাট বা সুরিনাম ঘাটের দিকে। অবহেলায় পড়ে থাকা এই ঘাট থেকেই একসময় মাদ্রাজ, উত্তরপ্রদেশ, বিহার ও বাংলা থেকে হাজারে হাজারে চুক্তিবদ্ধ শ্রমিক হিসাবে ক্রীতদাসদের পাঠানো হয়েছিল দক্ষিণ আমেরিকার সুরিনাম, ফিজি এবং ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের বিভিন্ন দেশে। পরবর্তীকালে ভারত ও সুরিনাম দুই দেশের উদ্যোগে সেই শ্রমিকদের স্মৃতিতে তৈরি হয় স্মারক।

বালুঘাটের পরের গন্তব্য বিচালি ঘাট। সিবতাইনাবাদ ইমামবাড়ার ঠিক উল্টোদিকের এই ঘাট থেকে এখন শুধুমাত্র ওপারে হাওড়া পর্যন্ত ফেরি পারাপার হলেও প্রায় দেড়শ বছর আগে এই ঘাটেই প্রথম এসে ভিড়েছিল ওয়াজিদ আলি শাহের জাহাজ। এখান থেকেই জাহাজে চেপে ইংল্যান্ডে রানির কাছে তদ্বির করতে গিয়েছিলেন ওয়াজিদ আলি শাহের মা এবং অন্যান্য পারিষদরা।

বিচালি ঘাট থেকে যখন ইমামবাড়ায় এসে পৌঁছনো হল, ঘড়িতে তখন প্রায় দেড়টা। একসাথে ইমামবাড়ার দালানে খাওয়াদাওয়ার পর আধুনিক ইতিহাসের ছাত্র এবং এলাকার স্থানীয় হাজিক নাওয়াজ আনসারি ঘুরে দেখালেন ইমামবাড়া, দেখালেন ওয়াজিদ আলি শাহ এবং তাঁর পরিবারের বিভিন্ন সদস্যের সমাধি। ঐতিহাসিক তথ্যের সাহায্যে লখনউয়ের শেষ নবাব ও তাঁর ছেলের শেষজীবনের বিভিন্ন ঘটনা তুলে ধরলেন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারীদের কাছে।

মধ্যাহ্নভোজের পর লেখক শামিম আহমেদ তাঁর লেখা রাজা ওয়াজিদ আলি শাহের জীবনকেন্দ্রিক উপন্যাস ‘আখতারনামা’ থেকে পড়ে শোনান নির্বাচিত অংশ। এর পাশাপাশি নবাবের শিল্প-সাহিত্য-সঙ্গীতের প্রতি অনুরাগ এবং আরও বিভিন্ন অজানা দিক সম্পর্কেও আলোকপাত করেন লেখক।

‘প্রতিবেশীকে চিনুন’ উদ্যোগের চেনা ছকেই ইমামবাড়া ঘুরে দেখা এবং শামিম আহমেদের বই পড়ার পর শুরু হল মত বিনিময়ের পালা। বিভিন্ন পেশা, বয়স ও অভিজ্ঞতার মানুষ একে একে বললেন তাঁদের প্রাপ্তির কথা, প্রতিবেশীকে জানার এই উদ্যোগে শামিল হয়ে কেমন লাগল সেই কথা, এবং সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ—সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের যে চেষ্টা দেশজুড়ে চলছে, তার বিরুদ্ধে কিভাবে একজোট হয়ে লড়াই করা যায়, সে বিষয়ে তাঁদের ব্যক্তিগত উপলব্ধির কথা। বিভিন্ন মত ও তর্কের মাধ্যমে উঠে এল নানান প্রসঙ্গ, এই লেখায় সেইসবের উল্লেখ সম্ভবপর না হলেও, ছবিতে তুলে ধরা যেতে পারে কিছু টুকরো মুহূর্ত।

ছবি : সুদীপ চক্রবর্তী 

 

Share

 

 

এখন আলাপ’ এ প্রকাশিত লেখাগুলির পুনঃপ্রকাশ বা যেকোনো রকম ব্যবহার (বাণিজ্যিক/অবাণিজ্যিক) অনুমতি সাপেক্ষ এবং নতুন প্রকাশের ক্ষেত্রে ‘এখন আলাপ’ এর প্রতি ঋণস্বীকার বাঞ্ছনীয়। এই ব্লগে প্রকাশিত কোনো লেখা পুনঃপ্রকাশে আগ্রহী হলে আমাদের ইমেল-এ লিখে জানান ebongalap@gmail.com ঠিকানায়।
আমরা আপনাদের মতামতকে স্বাগত জানাই। আমাদের সম্পাদকীয় নীতি অনুযায়ী মতামত প্রকাশিত হবে।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>

 


 
 

Ekhon Alap | এখন আলাপ

 

যে ভাষা আমারও : প্রসঙ্গ ভাষার লিঙ্গায়ন

লিঙ্গভিত্তিক হিংসাকে যদি আমরা একটা পিরামিড হিসেবে কল্পনা করি, তবে তার শীর্ষবিন্দুতে রাখতে হবে নারী বা তৃতীয় লিঙ্গের জীবনহানি-কে। ঠিক তার পরের ধাপেই থাকবে তাদের উপর যৌন অত্যাচার। তারপর নামতে নামতে সেই পিরামিডের শেষ ধাপ বা ‘ভূমি’-তে অবশ্যই থাকবে লিঙ্গায়িত ভাষা, যা বিভেদকে মননে, মেধায়, চিন্তনে,সংস্কৃতিতে চিরস্থায়ী করছে। মেয়ে হয়েও কেউ পরিবারের দায়িত্ব নিলে বাবা-মা খুশি হয়ে বলেন- ‘ও তো আমাদের ছেলে-ই।’  যুক্তিবাদী প্রবন্ধ লিখলে শুনতে হয়, ‘বোঝাই যায় না কোনো মেয়ের লেখা!’ পুরুষ গৃহকর্ম করলে  ‘তোমার বর রাঁধতেও পারে!’ ধরনের আপাত-নিরীহ বিস্ময় দুর্লভ নয়। ‘মেয়ে হলেও অঙ্কে ভালো’, ‘মেয়ে হলেও ফুটবলার’, ‘মহিলা-ক্রিকেট’, ‘মেয়ে-ডাক্তার’ এসব তো চলতি ভাষার অংশ৷ অন্যদিকে শোনা যায়, ‘Be a man’, ‘Have guts’, ‘ছেলেদের  কাঁদতে নেই’। প্রচারের ম্যানিফেস্টোয় ‘ছাপান্ন ইঞ্চির বুক’ উল্লিখিত হয়। তাঁর বিপক্ষ রাহুল গান্ধী বলেন, তিনি নাকি এক মহিলার (প্রতিরক্ষামন্ত্রী) পিছনে লুকিয়ে পড়েছেন। মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডনাল্ড ট্রাম্প যত্রতত্র নারীবিদ্বেষী ভাষা ব্যবহার করেন। ভাষার নিপীড়ন ক্ষমতাকে সন্দেহ করা তাই অবশ্যকর্তব্য হয়ে পড়ে।

Share

more | আরো দেখুন

 
 
 
Subscribe for updates | আপডেটের জন্য সাবস্ক্রাইব করুন


158/2A, Prince Anwar Shah Road (Ground Floor)
Kolkata - 700045
West Bengal, INDIA

contact@ebongalap.org

+91 858 287 4273

Share
 
 
 

ekhon-alap

জেন্ডার বিষয়ে এবং আলাপ-এর ব্লগ 'এখন আলাপ'। পড়ুন, শেয়ার করুন। জমে উঠুক আড্ডা, তর্ক, আলাপ।

এখন আলাপ

Share