• আমার আইডেণ্টিটি, আমার ইস্যু: এনআরসি প্রসঙ্গে একটি 'ক্যুইয়ার' আলাপ


    0    158

    February 15, 2020

     

     

    ওদের তিনজনকে আমি অনেকদিন ধরে চিনি। ১৮ বছর পেরিয়ে যেতে যেতেই ওরা গুটিসুটি চলে এসেছিল ক্যুইয়ার কালেক্টিভে যোগ দিতে। সেই থেকে জানা শোনা, দশ বছর পেরিয়ে গেলো দেখতে দেখতে।

    দশ বছর ধরে ওদের দেখছি, নিজেদের পরিচয় নিয়ে বিধ্বস্ত হতে, নিজেদের পরিচয়কে সামনে তুলে ধরার আকুল চেষ্টা করতে, নিজেদের পরিচয় নিয়ে নির্ভয় হবার প্রক্রিয়ায় মধ্যে দিয়ে একটু একটু করে অধিকারের প্রশ্নগুলোও বুঝতে এবং দাবি জানাতে। ওরা কেউ আন্দোলন করবে ভেবে জীবন শুরু করেনি, কিন্তু আন্দোলন না করলে এই ক্যুয়ার জীবনটা যেভাবে ওরা বাঁচতে চায় সেভাবে বাঁচা যাবে না এটা বুঝতে পেরে আপনা থেকেই ক্যুয়ার অধিকার আন্দোলনে শামিল হয়েছিল।

    ওদের প্রাথমিক পরিচয়ের ভিত্তি ছিল সমকামী, নারী বা জেন্ডার ক্যুয়ার, যার সঙ্গে আরও কিছু ইন্টারসেকশনাল পরিচয় জুড়লে হয়ে দাঁড়ায়—মেট্রো শহরবাসী, বাংলাভাষী, উচ্চশিক্ষিত, সাবর্ণ হিন্দু (একজন এসসি, কিন্তু ক্রিমি লেয়ার), কর্মরত, মধ্যবিত্ত, ইংরেজি বলতে পারে—মানে ব্যক্তিগত/পারিবারিক/সামাজিক পদমর্যাদা যথেষ্ট।

    ওরা তিনজন এইমুহূর্তে জীবনের অন্যান্য প্রাত্যহিকতার সঙ্গে যতদূর সম্ভব সমঝোতা করে অ্যান্টি এনআরসি-এনপিআর-সিএএ আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। কেন?

     

    তোমাদের সমস্যা কী? না তোমরা মুসলমান, না গরীব হিন্দু, এমন কী ছাত্রও তো নও আর! তাহলে?

    -নই তো, কোনওটাই নই, কিন্তু যার সমস্যা সেই শুধু কথা বলবে, আর বাকিরা কি মজা দেখবে? তারপর যেদিন সমস্যা আমারও হবে সেদিন দেখব আমি একা, অন্যের বেলায় যেমন আমি মজা দেখছিলাম, এখন অন্যেরা সেই মজাটা দেখছে।

    -না গো সুমিতাদি, কেউ আমাদের বেলায় পাশে দাঁড়াবে কিনা এত ভেবে শুরু করিনি আমি, এটা আমাদেরও সমস্যা এইটা মনে হচ্ছে। ইন ফ্যাক্ট সেটাই আমরা সবাইকে বলছি—ভেবোনা এটা কেবল মুসলমান মানুষদের ব্যাপার, যেমন আইপিসি ৩৭৭ কেবল সমকামীদের ছিল না, এনআরসি-এনপিআর-সিএএ কেবল মুসলমানদের টাইট দিয়ে দেশছাড়া করার জন্য নয়। হিন্দুরাষ্ট্র হয়ে গেলে সেখানে তুমি-আমি হিন্দুর জায়গা হবে কিনা সন্দেহ আছে।

    হিন্দুরাষ্ট্রে তোমাদের জায়গা কেন হবে না? সত্যিই তো আইপিসি ৩৭৭ চলে গেছে, ক্যুইয়ার মানুষদের তো আর ক্রিমিনালাইজ করা হচ্ছে না।

    -শোনো, হিন্দুরাষ্ট্র মানে ব্রাহ্মণ্যবাদী সব নিয়ম মেনেই তো সেটা হবে, শুধু কি সরস্বতীবন্দনা করিয়ে ছেড়ে দেবে ইস্কুলগুলো? আমি যেখানে পড়াই সেটার প্রতিষ্ঠাতাও ব্রাহ্মণ এবং বোর্ডও চালায় উচ্চবর্ণের লোকজন। সেখানে বাচ্চারা অলরেডি ‘হেইল হিটলার!’ স্টাইলে হাত তুলে গুড মর্নিং বলছে। এবার ভাবো পাকাপাকি হিন্দুরাষ্ট্র হয়ে গেলে আর কী কী হতে পারে। সেখানে কার জায়গা হবে?

    -ওই তখন আইয়ারের ছেলের সঙ্গে আয়েঙ্গারের ছেলের বিয়ে হবে আর চ্যাটার্জির সঙ্গে ব্যানার্জির মেয়ের বিয়ে হবে, আর তারা সুখে স্বচ্ছন্দে ঘরকন্না করবে। ওটাকে তুমি ক্যুইয়ার লিভিং বলবে? ক্যুইয়ার মানে যে চ্যালেঞ্জ করে, যে প্রশ্ন তোলে নর্মেটিভ লিভিং নিয়ে। সেটা জেন্ডার-সেক্সুয়াল ইস্যু নিয়েই যে শুধু হতে হবে এমন তো নয়, ধর্ম বা জাতপাত, বা যে কোনও ধরনের ফ্যাসিস্ট, ফান্ডামেন্টাল বিষয় নিয়েও হতে পারে। আমরা ক্যুইয়ার বলেই জায়গা হবে না, আমরা ক্যুইয়ার বলেই জায়গা চাই না।   

    -একটা সাফ কথা বুঝে গেছি, এটা মেজরিটেরিয়ান স্টেট। এই ফ্যাসিস্ট সরকার একসঙ্গে মনুবাদী, ইসলামোফোবিক আর পিতৃতান্ত্রিক। এবার আওয়াজ করে যদি নাও বলে আমরা হোমোফোবিক, আসলে এরা ক্যুইয়ারফোবিক। আর ট্রান্সফোবিক তো বটেই। ট্রান্স বিল দেখলেই সেটা বোঝা যায় যে না এরা কিছু বোঝে, না কারো ভালো করতে চায়। তার মধ্যে আমার দিকে দেখ, আমি তো ট্রান্সও নই, জেন্ডার ক্যুইয়ার, এরা আমাকে জায়গা দেবে? নাকি ওদের দেওয়া জায়গায় আমি থাকতে যাবো?

    -আমাদের নিজেদের মনের মধ্যেও চোরাগোপ্তা ইসলামোফোবিয়া আছে, আমি তো জানি আমার আছে, বা অ্যাট লিস্ট ছিল। সেটা থেকেই আমি রিলেট করতে পারি কী ভাবে সাধারণ মানুষকে উস্কানি দেওয়া হচ্ছে। আগে আমার মনে হত আমার সেক্সুয়ালিটি বা জেন্ডার আইডেন্টিটি-টাই বুঝি আমার ইস্যু, সেগুলো নিয়ে যেভাবে নাস্তানাবুদ হচ্ছি সেটাই শেষ কথা, এইসব অন্য গণ্ডগোলের মধ্যে মাথা দিয়ে কী হবে! আমার ইস্যুটা ডাইলিউটেড হয়ে যাবে কেবল। কিন্তু এখন যখন ইন্টারসেকশনালিটির লেন্স দিয়ে নিজেকে দেখছি, তখন বুঝছি আমার তো কোনও একটা আইডেন্টিটি নেই যে সেইটাই কেবল আমার ইস্যু হবে। আর আমার গায়ে এই মুহূর্তে ছেঁকা দিচ্ছে যেটা সেটাই কি শুধু আমার? আমার বন্ধুর ইস্যুটা আমার নয় কেন?

    -সিরিয়াসলি বলছি, এই অ্যান্টি এনআরসি-এনপিআর-সিএএ মুভমেন্টের মধ্যে দিয়ে যেতে যেতে কীভাবে কতো ইস্যুর সঙ্গে যে পরিচয় হচ্ছে! মানে এটা নয় যে সবাই সবটা ভালো করে বুঝছে, আমরা যেভাবে ফ্যাসিজম বিরোধী, হিন্দুত্ব বা মৌলবাদ বিরোধী রাজনীতি করতে এসেছি সচেতনভাবে, সবাই সেভাবে আসেনি। ধর পার্ক সার্কাসে যাঁরা বসে আছেন তাঁরা একেবারেই নিজেদের অস্তিত্বের লড়াই করছেন। কিন্তু মজা হল সেখানেও ওঁরা আস্তে আস্তে নিজেদের অস্তিত্বের সঙ্গে অন্য নানা অস্তিত্ব সম্পর্কে জানছেন, আমাদেরই মতো। আমি যখন আজাদি স্লোগানে ‘লেসবিয়ান মাঙ্গে আজাদি’ বা ‘ট্রান্স মাঙ্গে আজাদি’ বলছি, বলছি ‘দলিত মাঙ্গে আজাদি’—সেসব কি কেবল স্লোগান? আমি কি জাতপাত বুঝছি না? মুসলমান বুঝছি না? ওঁরা কি লেসবিয়ান একটুও বুঝছেন না? বুঝছেন, ওদের সঙ্গে কথা হচ্ছে তো, আগে যদি নাও বুঝে থাকেন, এখন তো বুঝছেনই। এটাই আমার কাছে পজিটিভ, মোমেন্ট টু মোমেন্ট, কিন্তু পজিটিভ। এখানে কেউ না বুঝে স্লোগান দিচ্ছেন না।

    ব্যাপারটা খানিকটা রিস্কি হয়ে যাচ্ছে না? তোমরা তো মার-টারও খেয়ে গেছ, তাইনা?

    -হ্যাঁ, ওই বাঘা যতীনের ঘটনাটা বলছ তো? আমরা তো ওইভাবেই প্রোগ্রামগুলো করছি—‘এফআইআর’ বলে যে কালেকটিভটা হয়েছে—‘ফেমিনিস্টস ইন রেসিসটেন্স’—ওখানে আমরা অনেকে আছি, অনেক রকম ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে। আমরা তো পাড়ায় পথসভা করছি, ছোট ছোট ডকুমেন্টারি দেখাচ্ছি, গান গাইছি, মানুষের সঙ্গে কথা বলছি এই ইস্যুটা নিয়ে। মানুষের কাছে যদি ঠিকঠাক ইনফো না থাকে তাহলে তাকে ভুল বোঝানো আরও সহজ।

    -দ্যাখো, ওরা ভয় পেয়েছে, পেয়েছেই, নইলে ওরকম একটা সভার পর হঠাৎ করে এসে পিটিয়ে দিয়ে যাবার চেষ্টা করে? আমরা তো দুটো ছেলেকে ধরেও ফেলেছিলাম, পুলিশ এলে তাদের হাতে তুলেও দিলাম, পাড়ার ছেলেরা ওদের মারতে যাচ্ছে দেখে সেই আমরাই ওদের বাঁচালাম। নইলে ওখানেই এক চোট মব লিঞ্চিং হয়ে যেত। থানায় বসে বসে অবধি একটা ছেলে কেবল ‘ভারতমাতা কি জয়’ বলেই যাচ্ছে, টিকা-ফিকা পরে এসেছিল, পুলিশ যা জিজ্ঞেস করছে কোনও উত্তরই দিচ্ছে না। ওইদিন তাও পুলিশ আমাদের সঙ্গে মোটামুটি ভালো ব্যবহার করেছিল, আবার দুদিন পরে যাদবপুর ইউনিভার্সিটির সামনে যখন ঝামেলা হল, তখন ছাত্রদেরই মেরেধরে অ্যারেস্ট করে নিল।

    -বইমেলায় কী হল? বিধাননগর পুলিশ অ্যান্টি সিএএ-এনআরসি-এনপিআর অ্যাক্টিভিস্টদেরই ধরল। শুধু ধরল না, মারল, মেয়েদের সঙ্গে অসভ্যতা করল, যা খুশি তাই করল। ভাবছি এখানেই যদি এই হয়, তাহলে ইউপি-তে সত্যি কী কী হচ্ছে! ব্যাপারটা হল কোনও না কোনভাবে মানুষকে দমন করা হবেই—ক্লাস, কাস্ট, জেন্ডার, সেক্সুয়ালিটি, ধর্ম—এইসবগুলোই দমনের অস্ত্র, রাষ্ট্র এটা করবেই। আমি হিন্দু আবার আপার কাস্ট, তাই আমাকে মেয়ে বলে বা লেসবিয়ান বলে দমন করছে, মুসলমান হলে সেটাও এরমধ্যে চলে আসত। যে মুসলমান সে আবার হেটেরো হয়ে বা পুরুষ হয়েও সুবিধা করতে পারছে না। মানে দমন করবেই।

    -আমার কীরকম লাগছে জানো তো, হেসো না সুমিতাদি, সিরিয়াসলি বলছি, আমি তো খুব ফ্রিডম ফাইটারদের জীবনী পড়তাম ছোটবেলায়, এক্সাইটিং লাগত, রোম্যানটিসাইজ করতাম। আমার মনে হচ্ছে এইটাই আমার চান্স, আমরা তো কেউ আসলে দেশের জন্য কিছু করিনি, অন্যেরা এই দেশটা আমাদের হাতে তুলে দিয়েছে আর আমরা যা-তা করে নষ্ট করছি কেবল। আমার জন্যে এইটাই ফ্রিডম ফাইটিং, দেশের জন্য কিছু একটা করছি, মনে হচ্ছে।

    -আমি বাবা জানি না দেশ মানে কী, আমার নিজেকে তো বাঙালি বলেই মনে হয়, আমি ভারতে থাকি, এই অবধি। কনস্টিটিউশনের ওপরে ভরসা রাখি এইজন্য যে সেটা অধিকারের লড়াই বা রেসিসটেন্সের হাতিয়ার। আলাদা করে কোনও রোম্যাণ্টিসিজম বা আবেগ নেই আমার। আমার স্কুলে, আমারই ক্লাসে একটা মুসলিম বাচ্চা আর একটা হিন্দু বাচ্চা মিলে মারপিট করেছে, যেমন বাচ্চারা করে। আমাকে বলা হল মুসলিম বাচ্চার সেকশন বদলে দিতে, কারণ—‘বোঝই তো, ওরা তো একটু অ্যাগ্রেসিভ হয়’। কিন্তু সুমিতাদি, এখানেই গল্পটা শেষ হল না, মুসলিম বাচ্চাটার মাও এসে আমাকে এটাই করতে বলল, নিজের ছেলেরই দোষ দিল, তাকে আগে থেকেই যে মেরে ফাটিয়েছে সেটাও বলল, অর্থাৎ—ও তো মুসলিম, ওর তো জানার কথা হিন্দু ছেলের পিছনে লাগলে কী হতে পারে, ও লাগতে গেল কেন—ওর মা পরিষ্কার বলল এই কথা। এর পরেও কোনটা কার ইস্যু এই নিয়ে মাথা ঘামাতে বলছ? এরপরেও কিছু না করে চুপ করে চেপে যাব? বলছ?                              

    বলছি?!!!

     
     



    Tags
     


    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>

     



    তথ্য নীতি | Privacy policy

 
Website © and ® by Ebong Alap / এবং আলাপ, 2013-24 | PRIVACY POLICY
Web design & development: Pixel Poetics