Ebong Alap / এবং আলাপ
 

'যো বিবি সে করে পেয়ার' : নজরে প্রেস্টিজ

(February 5, 2019)
 

আমাদের এবারের নজরে বিজ্ঞাপনে দেখব প্রেস্টিজ প্রেশার কুকারের দুটি বিজ্ঞাপন যাদের মধ্যে অনেক দিনের তফাৎ। যুগের সঙ্গে সঙ্গে বাজারের গল্প কী ভাবে বদলে যায়, বিজ্ঞাপন দু'টি সেই গল্পই বলে। বিজ্ঞাপন দু'টি একবার দেখলেই আপনাদের নজরে পড়বে, প্রোডাক্টের চেহারা আর নারী ও পুরুষ চরিত্রগুলোর ভূমিকায় বদল।

প্রেস্টিজের পুরোনো বিজ্ঞাপন

এখনও আমাদের দেশে বাড়ির রান্না মূলত মহিলারাই করেন। দুটি বিজ্ঞাপনেই আমরা সে রকম আন্দাজই পাই। প্রথম বিজ্ঞাপনে রান্নাঘর না দেখা গেলেও পরিষ্কার যে স্বামীটি স্ত্রী-র ব্যবহারের জন্যেই প্রেশার কুকার কিনছেন। কিন্তু কেনবার গোটা প্রক্রিয়ার মধ্যে স্ত্রী-র কোনও ভূমিকা নেই। পুরুষ দোকানদার আর পুরুষ ক্রেতার মধ্যে কথা চলছে। এমন কী বিজ্ঞাপনের যে মূল কথা, যে প্রেস্টিজ বাকি প্রেশার কুকারের চেয়ে বেশি নিরাপদ, তার মানে মহিলার প্রাণ বাাঁচাবে, সেই প্রয়োজনীয়তাটাও ঘুরিয়ে স্বামীর পত্নী-প্রেমের সূচক হিসেবে দেখানো হচ্ছে। নিজের প্রাণ বাঁচানোর দায়টুকুও মহিলা নিতে পারছেন না, তিনি পুরোপুরিই আমরা যাকে বলি ‘প্যাসিভ’ (ঠিক বাংলাটা পেলাম না)। এ ছাড়াও বোঝা যাচ্ছে, এই সময়ে বাজারে প্রেশার কুকার নতুন আসছে, তাই সেটা কী ভাবে কাজ করে সেটাও বোঝাবার দরকার হচ্ছে। এই সময়ে বাজারে প্রেশার কুকার – এই প্রোডাক্টটাকেই বিক্রি করবার দরকার আছে, আর তার মধ্যে, প্রেস্টিজ ব্র্যান্ডের 'ইউনিক সেলিং প্রপোজিশন' হচ্ছে ওই গ্যাসকেট রিলিজের ফাঁক, যা প্রেশারটাকে বেরুতে দেয়, কুকারের ফেটে ষাওয়ার বিপদ আটকায়। তাই অন্য প্রেশার কুকারের বদলে এটা কেনা ভালো বলা হচ্ছে। এটা ভারতীয় বাজারের সেই সময়ের চেহারা যখন নতুন পরিবার নতুন নতুন প্রোডাক্ট ব্যবহারের মধ্য দিয়ে আধুনিকতায় প্রবেশ করছে।

এর পরের ছবি ২০১৩। ভারতীয় বাজার ইতিমধ্যে অনেক এগিয়ে গিয়েছে। প্রেস্টিজ কুকারের চেহারাও বদলে গিয়ে অনেক আধুনিক হয়ে উঠেছে। সেই রকমই আধুনিক ঐশ্বর্যা রাই আর অভিষেক বচ্চনের জীবনযাত্রা। রান্না ঘরের যে সেটটা বানানো হয়েছে, সেটাও চিত্রতারকাদের বাড়ি সম্পর্কে আমাদের ধারণা অনুযায়ী।

প্রেস্টিজের সাম্প্রতিক বিজ্ঞাপন

প্রেশার কুকার কাকে বলে তা ইতিমধ্যে বাজারের ক্রেতারা জানেন। আপনি যদি প্রেশার কুকার কিনতে গিয়ে থাকেন তবে দেখবেন, অনেক কম দামী প্রেশার কুকারে বাজার ছেয়ে গিয়েছে, প্রেস্টিজ বা হকিন্স তাঁরাই কেনেন, যাঁরা বেশি দাম দিয়ে ‘ভালো’ জিনিস কিনতে চান। আর এখানেই বিজ্ঞাপনের গল্পটা বদলে যায়। কারণ, অনেক কম দামের প্রেশার কুকার যদি এখন মোটামুটি ‘ভালো’ মানের নিরাপত্তা দেয়, তবে কেবল কাজের কথা বলে, নিরাপত্তার কথা বলে, বেশি দামের একটা ব্র্যান্ডকে বিক্রি করা যায় না। কুকারের ব্যবহারিক মূল্যের চেয়ে প্রতীকী মূল্যের ওপর বেশি জোর দিতে হয়। তাই বিজ্ঞাপন রূপকথা বলে: এই নতুন ধরণের প্রেশার কুকার কিনে ক্রেতা একটা নতুন লাইফস্টাইল কিনছেন, যেটা তার মাইক্রোওয়েভ, ডাবল ডোর ৫২০ লিটারের ফ্রিজ, হ্যাচব্যাক গাড়ি কেনার স্বপ্নের সঙ্গে মানানসই, আরও আরও ‘ভালো’ থাকার গল্পের প্রথম ধাপ, যেটা তুলনামূলক কম খরচেই পেরোনো যায়। এই গল্পের 'বউ' তাই আধুনিকা, মনে হয়, ‘স্বাধীন,’ প্রেস্টিজ তিনি নিজের সিদ্ধান্তে (এবং হয়তো নিজের পয়সায়) কিনেছেন, তাই তিনি স্বামীকে বলেন প্রেস্টিজ নিয়ে তুমি কোনও কথা বলবে না।  এই বিজ্ঞাপনে আবার এরা নামহীন মডেল নন, রক্ত মাংসের চিত্রতারকা – শুটিং ইত্যাদির কথা বলে অভিষেক আর ঐশ্বর্যাকে তাদের 'রিয়েল লাইফ' ভূমিকাতে দেখানো হয়েছে।

আপাতত শুধু একটা প্রশ্ন করবেন না, যে, দুজনেই প্রফেশনাল হলে ( এবং যত দূর জানি শুটিং-এ ঐশ্বর্যা বেশি ব্যস্ত থাকেন) রান্নাটা ঐশ্বর্যাকে কেন করতে হয়? তবে ভাববেন না, পরের বিজ্ঞাপনে অভিষেক রান্না করতেই পারেন, যদি বাজারের ছবি তখন তাই হয়। মাল বিক্রি হলে বিজ্ঞাপন সব করতে রাজি! 

 

Share

 

 

এখন আলাপ’ এ প্রকাশিত লেখাগুলির পুনঃপ্রকাশ বা যেকোনো রকম ব্যবহার (বাণিজ্যিক/অবাণিজ্যিক) অনুমতি সাপেক্ষ এবং নতুন প্রকাশের ক্ষেত্রে ‘এখন আলাপ’ এর প্রতি ঋণস্বীকার বাঞ্ছনীয়। এই ব্লগে প্রকাশিত কোনো লেখা পুনঃপ্রকাশে আগ্রহী হলে আমাদের ইমেল-এ লিখে জানান ebongalap@gmail.com ঠিকানায়।
আমরা আপনাদের মতামতকে স্বাগত জানাই। আমাদের সম্পাদকীয় নীতি অনুযায়ী মতামত প্রকাশিত হবে।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>

 


 
 

Ekhon Alap | এখন আলাপ

 

যে ভাষা আমারও : প্রসঙ্গ ভাষার লিঙ্গায়ন

লিঙ্গভিত্তিক হিংসাকে যদি আমরা একটা পিরামিড হিসেবে কল্পনা করি, তবে তার শীর্ষবিন্দুতে রাখতে হবে নারী বা তৃতীয় লিঙ্গের জীবনহানি-কে। ঠিক তার পরের ধাপেই থাকবে তাদের উপর যৌন অত্যাচার। তারপর নামতে নামতে সেই পিরামিডের শেষ ধাপ বা ‘ভূমি’-তে অবশ্যই থাকবে লিঙ্গায়িত ভাষা, যা বিভেদকে মননে, মেধায়, চিন্তনে,সংস্কৃতিতে চিরস্থায়ী করছে। মেয়ে হয়েও কেউ পরিবারের দায়িত্ব নিলে বাবা-মা খুশি হয়ে বলেন- ‘ও তো আমাদের ছেলে-ই।’  যুক্তিবাদী প্রবন্ধ লিখলে শুনতে হয়, ‘বোঝাই যায় না কোনো মেয়ের লেখা!’ পুরুষ গৃহকর্ম করলে  ‘তোমার বর রাঁধতেও পারে!’ ধরনের আপাত-নিরীহ বিস্ময় দুর্লভ নয়। ‘মেয়ে হলেও অঙ্কে ভালো’, ‘মেয়ে হলেও ফুটবলার’, ‘মহিলা-ক্রিকেট’, ‘মেয়ে-ডাক্তার’ এসব তো চলতি ভাষার অংশ৷ অন্যদিকে শোনা যায়, ‘Be a man’, ‘Have guts’, ‘ছেলেদের  কাঁদতে নেই’। প্রচারের ম্যানিফেস্টোয় ‘ছাপান্ন ইঞ্চির বুক’ উল্লিখিত হয়। তাঁর বিপক্ষ রাহুল গান্ধী বলেন, তিনি নাকি এক মহিলার (প্রতিরক্ষামন্ত্রী) পিছনে লুকিয়ে পড়েছেন। মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডনাল্ড ট্রাম্প যত্রতত্র নারীবিদ্বেষী ভাষা ব্যবহার করেন। ভাষার নিপীড়ন ক্ষমতাকে সন্দেহ করা তাই অবশ্যকর্তব্য হয়ে পড়ে।

Share

more | আরো দেখুন

 
 
 
Subscribe for updates | আপডেটের জন্য সাবস্ক্রাইব করুন


158/2A, Prince Anwar Shah Road (Ground Floor)
Kolkata - 700045
West Bengal, INDIA

contact@ebongalap.org

+91 858 287 4273

Share
 
 
 

ekhon-alap

জেন্ডার বিষয়ে এবং আলাপ-এর ব্লগ 'এখন আলাপ'। পড়ুন, শেয়ার করুন। জমে উঠুক আড্ডা, তর্ক, আলাপ।

এখন আলাপ

Share