• দানবের সাথে লড়াইয়ের প্রস্তুতি: সোনাগাছিতে এনআরসি


    0    533

    January 10, 2020

     

     

    সোনাগাছিতে নাকি ইদানীং অচেনা মহিলাদের দেখা যাচ্ছে, যারা রাস্তায় দাঁড়ানো মেয়েদের জিজ্ঞেস করছে আধার, ভোটার কার্ড ঠিকঠাক আছে কিনা। শুনেই আমার মনে এল, আসাম এনআরসিতে জাল কাগজ বানাবার জন্য প্রচুর টাকা ওড়াউড়ির কথা। শেষমেশ সে কাগজ কাজে লেগেছে কিনা সে এক প্রতীক হ্যাজেলাই জানে, কিন্তু এই মেয়েরা ঠেকে বা ঠকে প্রচুর বুদ্ধি রাখে। ‘হ্যাঁ হ্যাঁ, সব কাগজ ঠিক আছে’—ব'লে তারা অচেনা মুখগুলোকে ফুটিয়ে দিতে দেরি করেনি। কে জানে, কাগজ বানিয়ে দেবে এই আশ্বাস দিতে বা কতোজনকে ডিটেনশন ক্যাম্পে পাঠানো যাবে সেই হিসাব কষতে এসেছিলো কিনা ওরা!  

    কী পাইনি তার হিসাব মেলাতে

    "

    এনআরসিতে উন্নতির লিগ্যাসি পার্সন কে হবে?

    পৃথিবীতে  নিজের অস্তিত্বের কোনো প্রমাণ না রেখে মরে হেজে যাওয়া ভাগচাষী বাবা,

    নাকি যার কাছ থেকে পালিয়ে এসে বেঁচেছে, সেই অত্যাচারী স্বামী? 

    সোনাগাছিতে এমন উন্নতি বিশ্বাস কিন্তু হাজারটা আছে। 

     "

    যারা ভাবে—সাঁঝের আঁধার নামিবে যখন—তখনই কেবল সোনাগাছি আড়মোড়া ভাঙে, তারা ঠিক জানে না। সকাল-বিকেল-দুপুর কাস্টমার ডাকলে যেতেই হবে, তাই মেয়েদের সঙ্গে এনআরসি নিয়ে আলোচনার সময় ঠিক করতে ভাবতে হচ্ছিল। বেলা বারোটা স্থির হলেও আমার কাজ পড়ে যাওয়ায় দেরি হলো। তবু দেখি পড়াশেষে বাচ্চারা সেন্টার ছেড়েছে, কিন্তু মায়েরা কেউ কেউ তখনও বসে আছে।

    কেউ একজন বড়ে দিলওয়ালে এসেছিল—বাচ্চাদের ব্যাগ, টিফিনবাক্স উপহার দিয়ে গেছে। মায়েরা তাই নিয়ে বলাবলি করছে—এসবের অভাব তো নেই, অভাব ভালো সঙ্গের, ভালো শিক্ষার আর ভালো আশ্রয়ের। বিশেষ করে সন্ধের পর। সারাদিনে বাচ্চাকে ঘন ঘন রাস্তায় বার ক'রে দেওয়া যায়, কিন্তু অন্ধকারে এই আঁকাবাঁকা গলি শিশুঘাতী হয়ে ওঠে। মানুষের ভয় ভূতের চাইতে কিছু কম নয়! 

    ওদের আলোচনা শুনতে শুনতে মনে হয় একজন নাগরিকের রাষ্ট্রের কাছ থেকে যা পাওনা তার কতোটুকু চুঁইয়ে আসে এদের কাছে যে নাগরিকপঞ্জিতে নাম তোলার নামে এই ভঙ্গুর জীবনগুলিকে চূড়ান্ত অস্থির করবার এতো তোড়জোড় চলছে সরকারি ব্যবস্থাপনায়! 

    সোনাগাছির অনেক মেয়ের প্যান কার্ড, পাসপোর্টও আছে। কিন্তু নিজের নামে ফ্ল্যাট বা বাড়ি খুব কম। স্বাভাবিক, কারণ গোটা জীবনই তাদের কাটে ঘেটোতে। অন্য পাড়া বা এলাকায় সম্পত্তি কেনাবেচার স্বাধীনতা তাদের কোথায়! উপরন্তু এদের বেশির ভাগই পরিবার-পরিত্যক্ত। পরিজনের কাছে তাদের অস্তিত্ব নেই। তারা মৃত। যাদের টাকা পরিবারে নিয়মিত যায় তাদেরও অবদানের কোনো স্বীকৃতি নেই। এই কামধেনুরা অনেকে অন্য পেশার কথা চাউর ক'রে বাপের বাড়িতে সন্তান রেখে মানুষ করে, উপার্জনের বেশির ভাগটাই সেখানে ঢালে, কিন্তু সবই সঙ্গোপনে। পড়শি অথবা আত্মীয় জানতে পেলে অনর্থ হবে। ফলে বোঝাই যাচ্ছে পিতার বা মাতার সম্পত্তির ছিটেফোঁটাও এদের কপালে জুটবার কোনো চান্স নেই।

    আর পৈতৃক সম্পত্তি থাকলে তো! সোনাগাছিতে সম্পত্তিওয়ালা পরিবার থেকে আসা মেয়ে সংখ্যায় খুব কম। বেশির ভাগই হতদরিদ্র। উদরজ্বালায় অথবা প্রেমজ্বরে প্রথমে পদস্খলন, তারপর ঠাঁই দুর্গাচরণ মিত্র স্ট্রিটের দু’দিকে ঢুকে যাওয়া অক্টোপাসের সরু হাতের মতো কিলবিলে গলিতে। যেমন উন্নতি—উন্নতি বিশ্বাস। টাইট টপ, জিনস, খোলা চুল, সোনার গয়না পরা মিষ্টি এবং অল্পবয়সী মেয়েটিকে দেখে ভাবতেই পারিনি ওর দুটো বাচ্চা আছে! উন্নতি পরিষ্কার জানালো ওর বাবা ছিল ভাগচাষী। পড়াশোনা দূরে থাক, চারটি ভাইবোনকে খাবারই দিতে পারতো না। তারপর বাঁধিয়েছিল রাজরোগ টিবি। দেখতে শুনতে ভালো ছিল ব'লে চোদ্দ বছুরে উন্নতি বিয়ের বলি হয়ে রোজ মার খেতো স্বামীর কাছে। তারপর দুটো বাচ্চা নিয়ে কী করে যেন ঠাঁই হলো সোনাগাছিতে।    

    এনআরসিতে উন্নতির লিগ্যাসি পার্সন কে হবে? পৃথিবীতে  নিজের অস্তিত্বের কোনো প্রমাণ না রেখে মরে হেজে যাওয়া ভাগচাষী বাবা, নাকি যার কাছ থেকে পালিয়ে এসে বেঁচেছে, সেই অত্যাচারী স্বামী? 

    সোনাগাছিতে এমন উন্নতি বিশ্বাস কিন্তু হাজারটা আছে।   

    এনআরসি ও সোনাগাছির শিশু

    "

    প্যাট্রিলিনিয়াল লিগ্যাসি শেষ কথা হলে

    যৌনকর্মীর নিজের এবং যৌনকর্মীর সন্তানের নাগরিক হবার কী হবে?

    "

    যৌনকর্মী মায়েরা পেশার কারণে নিজেদের বাইরেটা খুব সাজিয়ে গুছিয়ে রাখলেও, স্বাস্থ্যের দিক থেকে খুব বিপজ্জনক অবস্থানে থাকে সবসময়। বসন্তের দিন এতো ক্ষণস্থায়ী এদের জীবনে যে দেদার টাকা মুঠোতে ধরবার বাসনায় সপ্তাহের সাত দিনেই এরা দিনে গড়ে কুড়ি বা তার বেশিসংখ্যক কাস্টমার নিতে  ইতস্তত করেনা। ফলে মুঠো মুঠো ব্যথা মরার ওষুধ ও প্রবল নেশা এদের নিত্যসঙ্গী। নিজেদের না আছে বার্থ সার্টিফিকেট বা স্কুলের সার্টিফিকেট, না আছে উত্তরাধিকারের দলিল, কিন্তু বাচ্চাদের কাগজের বেলায় এরা খুব হুঁশিয়ার। প্রায় প্রত্যেকের একাধিক বাচ্চা। আশ্চর্য, এরা বেশির ভাগই একের অধিক সন্তান কামনা করে! সেটা বাৎসল্যের প্রাবল্যে, নাকি ভবিষ্যতের লগ্নি হিসেবে জানিনা, কিন্তু বাচ্চাদের বার্থ সার্টিফিকেট এরা চাইলেই বার ক'রে দেবে। টিকাকরণের কাগজ, স্কুলে ভর্তির প্রমাণ, সব মা-ই যত্ন ক'রে গুছিয়ে রাখে। সবাই চায় বাচ্চা লেখাপড়া ক'রে অন্য পেশায় যাক। কিছু ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ঘটে, বিশেষ ক'রে কন্যাসন্তানের ক্ষেত্রে, কারণ অনেক সময় মেয়েকে এই বৃত্তিতে না নামিয়ে উপায় থাকে না। তার কারণ হতে পারে মায়ের বৃদ্ধাবস্থা ও আসন্ন অনাহার, হতে পারে মেয়ের বয়ঃসন্ধির কৌতুহল এবং পেশা করবার জেদাজেদি (যৌনকর্মীর বৃত্তি এই মহল্লায় পেশা করা বলেই পরিচিত)। অথবা মায়ের মতোই ধান্দাবাজ প্রেমিকের সঙ্গে গৃহত্যাগ এবং পুনরাগমন। 

    সুরক্ষিত অন্যান্য প্রমাণের ভিত্তিসম্পন্ন যৌনকর্মীর সন্তান জীবনের অন্য ক্ষেত্রে সুপ্রতিষ্ঠিত হোক বা পেশা করুক, এনআরসিতে তারও তো লিগ্যাসি ডাটা চাই। উন্নতি বিশ্বাসের সন্তানের মা যে উন্নতি, তা নয় বার্থ সার্টিফিকেট দেখে বোঝা গেল। কিন্তু পিতৃপরিচয়? এইখানেই তাকে ডিটেনশন ক্যাম্পের রাস্তায় এগিয়ে রাখবে নাগরিকপঞ্জীকরণ। কারণ সোনাগাছি পিতৃপরিচয় নিয়ে মাথা না ঘামালেও ছাতাপড়া সমাজ ও মনুবাদী রাষ্ট্র তার বাসিন্দাদের ছেড়ে দেবে না। 

    সোনাগাছিতে নানা সুরক্ষা সত্বেও গর্ভসঞ্চার হলে গর্ভপাত আকছার, তবুও মা হতে ইচ্ছুক থাকে অনেকে। তেমন একজন যৌনকর্মীর পক্ষে বলা অসম্ভব কে তার সন্তানের পিতা। অনেকসময় চেহারার মিল ইত্যাদি দ্বিতীয় স্তরের প্রমাণে পিতৃত্ব বোঝা গেলেও পার্মানেন্ট খদ্দের হারানোর ভয়ে মা-টিকে সব চেপে যেতে হয়। আর খদ্দেরও সদাসতর্ক থাকে যেন তার পিতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত না হয়ে পড়ে—কারণ সোনাগাছি শুধু ফূর্তি করবার জায়গা, সামাজিক লজ্জায় জড়িয়ে পড়তে বা কোনো দায়দায়িত্ব নেবার জন্য এখানে কেউ আসেনা। 

    এইসব কারণে এখানে চালু রয়েছে একটি গোপন লজ্জাকর অসহায় প্রথা—বাবু রাখা। হিন্দু যৌনকর্মীরা সকলেই শাঁখা-সিঁদুর পরে যে পুরুষের মঙ্গলকামনায়, তার সঙ্গে সাতপাকে বাঁধা পরার সৌভাগ্য তার হয়না শতকরা নিরানব্বইটি ক্ষেত্রে। মুসলমানীর নেই কোনো কাবিননামা। অথচ এই বাবু বিবিরা স্বামী-স্ত্রীর মতোই একসঙ্গে বসবাস করে, সংসারধর্ম পালন করে। উনিশ শতকের বাবুরা মহা আড়ম্বরে, সামাজিক প্রতিষ্ঠা প্রমাণে রক্ষিতা পুষতেন, একবিংশ শতকে যৌনপল্লীতে গুটিকয়েক নিপীড়িত মেয়ে সুরক্ষা ও নকল সংসারখেলার কারণে গোপনে লুকিয়ে লুকিয়ে বাবু পোষে। কী বিচিত্র মহাকালের রথের চাকার ঘূর্ণন!   

    লুকিয়ে পোষার কারণ, এই বাবুদের বিয়ে করা বউ ও ছেলেপুলের সংসার থাকে। সেই সংসারও হয়তো সোনাগাছির নকল বউয়ের উপার্জনে চলে। কিন্তু সে যে যৌনকর্মীর পোষা বাবু, একথা মরে গেলেও বলা চলবে না। পিতৃতন্ত্রের কাছে সামাজিক সম্মান সোনার চেয়েও দামী। কিন্তু সোনাগাছির বাচ্চারা যখন স্কুলে ভর্তি হয় এই বাবুর নামই বসে পিতার নামের কলামে। কোনো খদ্দের যখন চূড়ান্ত বিকৃতিতে মেয়েটিকে অসহ্য যন্ত্রণার দোরগোড়ায় নিয়ে যায়, তখন বাঁচানোর জন্য এই বাবুর ডাক পড়ে। আবার বাবু বিবির সঙ্গে ঝামেলার পর নিজের সংসারে ফিরে গেছে বলে পেশাগত সাফল্যের চূড়ায় থাকা পরমাসুন্দরী মেয়েটি সাজতে সাজতে হাপুস কাঁদছে, এ আমার নিজের চোখে দেখা। 

    এই বাবু তাহলে দুটি সংসারের কর্তা। দুই নারীর স্বামী, দুপক্ষের বাচ্চার অভিভাবক। একপক্ষ আইনসিদ্ধ, অন্যপক্ষ পুরো বে-আইনী। আইন কি তার এই স্ট্যাটাস মেনে নেবে? এনআরসি এবং সিএএ-তে স্বামীর এবং পিতার নামের জায়গায় বাবুর নাম বসিয়ে সোনাগাছির মা ও শিশু নাগরিকপঞ্জীর অন্তর্ভুক্ত হতে পারবে তো? সন্তান কী ক'রে প্রমাণ করবে বাবুটিই তার পিতা? পুরনো ভোটার লিস্টে বাবার নাম, ফ্যামিলি ট্রিতে বাবা, সম্পত্তির দলিলে বাবা—এনআরসিতে এইরকম বহুবিধ নামভূমিকায় বাবাকে দেখা গেলেও মায়ের দিকের কোনো প্রমাণ নাকি আসাম এনআরসিতে গ্রাহ্য হয়নি। প্যাট্রিলিনিয়াল লিগ্যাসি শেষ কথা হলে যৌনকর্মীর নিজের এবং যৌনকর্মীর সন্তানের নাগরিক হবার কী হবে? বাবু-বাবু-খেলা সত্বেও আসলে তো সে সিংগল মাদার, একলা মা।   

    সোনাগাছিতে সাম্প্রদায়িকতা

    "

    মাদুরে বসা একজন চেঁচিয়ে ওঠে, চলে যাব তাহলে ডিটেনশন ক্যাম্পে।

    এমন কী ভালো আছি এই জীবনে!

    পাশের জন তাকে সান্ত্বনা দেয়, দুদ্দুর, ওসব কিছুই হবে না দেখবি।

    হেঁদুমোল্লা মিলে এতোজন আছি আমরা।

    ভয় কী!

    "

    এমনিতে মোদি শাহের যে মূল ধান্ধা ধর্মীয় বিভাজন তা সোনাগাছিতে প্রায় নেই বললেই চলে। দুই যৌনকর্মী, একজন হিন্দু, অপরজন মুসলমান, এক ঘর ভাড়া ক'রে থাকে, একসঙ্গে খাওয়াদাওয়া এরকম দেখাই যায়। হিন্দু মেয়ে মুসলমান বাবু রেখেছে বা উল্টোটা, তাও দেখেছি। তাদের মিশ্ররক্তের সন্তানরাও একই স্কুলে পড়তে আসে। কী তাদের ধর্ম কেউ জিজ্ঞাসা করে না। শনি মন্দির, শীতলা মন্দিরে বা মাজারে সবাই মাথা ঠোকে। আর কাস্টমারের জাত নেই এই তল্লাটে। পকেটে পয়সা থাকলেই হল। আর কিছুই—শারীরিক বা মানসিক সৌন্দর্য, বংশপরিচয়, শিক্ষা, চাকুরি, রোগবালাই, বিকৃত রুচি কোনটাই বিচার্য নয়। ফলে সাম্প্রদায়িক নাড়াবাজিতে সোনাগাছি কাঁপে না। কিন্তু মেয়েদের সঙ্গে কথা বলে মনে হলো এখানেও বিষ ঢোকাবার চেষ্টা হয়েছে। অনেকেই বলছিল, এনআরসি তো আসলে মোল্লাদের টাইট দেবার জন্য করা হচ্ছে। সপনা নামের মেয়েটি বলছিলো, এনআরসির উদ্দেশ্য ভালো, কিন্তু কার্যকর করা হচ্ছে অত্যন্ত বাজে ভাবে। আসামের কথা এরা সবাই কিছু কিছু জানে। তবে সিলেক্টিভ ইনফরমেশন।  মুসলমানদেরই শুধু টাইটে রাখা হবে যদি, তাহলে আসামে উনিশ  লক্ষ 'বিদেশি'-র মধ্যে বারো লক্ষ হিন্দু কেন সে প্রশ্নের উত্তর এরা জানে না দেখলাম। সিএএতে বাবা-মায়ের নাম, তাদের জন্মস্থান উল্লেখ করতে হবে শুনে উড়ে এলো চোখা চোখা অশ্রাব্য গালি। ওদের কাছে ভরসার কথা হলো, দিদি পশ্চিমবঙ্গে এটা করতে দেবে না। যুক্তরাষ্ট্রে রাজ্যের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা বুঝিয়ে বললে রঙমাখা মুখগুলি কালো হয়ে যায়। মাদুরে বসা একজন চেঁচিয়ে ওঠে, চলে যাব তাহলে ডিটেনশন ক্যাম্পে। এমন কী ভালো আছি এই জীবনে! পাশের জন তাকে সান্ত্বনা দেয়, দুদ্দুর, ওসব কিছুই হবে না দেখবি। হেঁদুমোল্লা মিলে এতোজন আছি আমরা। ভয় কী!

    দানবের সাথে লড়াইয়ের প্রস্তুতি

    "

    বুনিয়াদি অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধান চায় সোনাগাছি।

    আর সেসব ভুলিয়ে দেবার জন্য নামানো হয় এনআরসি, সিএএ-র খাঁড়া।

    বধ্যভূমিতে রক্তের গন্ধের মধ্যে দাঁড়িয়ে এখনো সোনাগাছির শিরদাঁড়া ঋজু।

    তবে তা কতোকালের জন্য কেউ জানে না!

    "

    তবে এনআরসি নিয়ে সোনাগাছিতে সাজো সাজো রব পড়ে গেছে। অনীতাদি নামে এক বর্ষীয়ান মহিলা দুর্বারের সঙ্গে একুশ বছর কাজ করছে। সে পরিষ্কার বলল, আমাদের বলা হয়েছে এনআরসি বা নো এনআরসি, কাগজ যেন ঠিক রাখা হয়। সে কাগজ এরা দেখাবে কিনা সে প্রশ্ন পরের, কিন্তু সমস্ত রকমের পরিচয়পত্র যেন মেয়েদের থাকে সে ব্যাপারে জোর দেওয়া হচ্ছে। এমনকি দলে দলে মেয়েরা আদালতে গিয়ে আবেদন করে ম্যাজিস্ট্রেটকে দিয়ে এফিডেবিট করিয়ে রাখছে।  

    এই ভয় এদের ক্ষেত্রে একেবারেই অমূলক নয় সেটা এই মেয়েদের মতো আর কে জানে! সমাজ এদের ব্যবহার করে, কিন্তু অহরহ ঝেড়ে ফেলতে চায়। রাষ্ট্র এদের স্বীকারই করে না। না আছে এই পেশার স্বীকৃতি, না মানুষগুলোর শ্রমের মর্যাদা। আত্মীয়, বন্ধু এমনকী সন্তানও সুযোগ পেলে এই নারীদের অস্বীকার করে। চূড়ান্ত পাঁক, অত্যাচার, কুস্বাস্থ্য, একাকীত্ব আর দারিদ্রের মধ্যে মুখ গুঁজে থাকা এই মেয়েদের কাছে এনআরসি হলো বোঝার ওপর শাকের আঁটি। চাপানো মাত্র মুখ থুবড়ে পড়বে। ফলে যেটুকু প্রস্তুতি, ঝড়ের মুখে কুটোর মতো হলেও সেটুকু নিয়ে রাখতেই হয়।

    আমার একটা কথায়  মেয়েরা খুব মজা পেল। আমি যখন বললাম কোর্ট কেস থাকলে সেই কাগজপত্র যেন খুব যত্ন ক'রে রাখা হয়, তখন এ-ওর গায়ে হেসে গড়িয়ে পড়ে আমায় জানালো যে কোনো না কোনো কোর্ট কেসে জড়ায়নি এরকম মেয়ে এখানে খুব কম। যে তল্লাটে কাস্টমার ভাগিয়ে নিলে শুনতে হতে পারে পৃথিবীর সবচেয়ে অশ্রাব্য গালি, চুল ধরে নোংরা রাস্তায় শুইয়ে মেরে ক্ষতবিক্ষত ক'রে দেওয়া হতে পারে, যেখানে মদ্যপ দালালের ছুরি আহত করতে পারে যখন তখন, টাকা না দিয়ে বিকৃত-লালসা কাস্টমার যেখানে অবলীলায় মেয়েটির কণ্ঠনালী ফাঁক ক'রে নিশঃব্দে দরজা ভেজিয়ে বেরিয়ে যায়, বাবুও বিশ্বাসঘাতকতা ক'রে দেরাজ ফাঁকা ক'রে দিয়ে কেটে পড়ে, সেখানে কোর্ট কেসে জড়িয়ে না পড়ে উপায় আছে!  তাই মামলার কাগজপত্র এনআরসি-স্বীকৃত ডকুমেন্ট শুনে মেয়েরা খুব একচোট হাসে, হাসতেই থাকে।   

    এনআরসি এই মহল্লায় এক অজানা জুজু যার সঙ্গে লড়াইয়ের জন্য মেয়েরা মিটিং মিছিলেও যাচ্ছে। অনীতাদি এখন পেশায় নেই, সংগঠন করে, গত সপ্তাহে সে চারটে মিছিলে হেঁটেছে। এরা জিএস টি, ডিমনিটাইজেশন সব ব্যাপারে অকুন্ঠ মতামত দেয়। আমি বাবা রাজনীতিটা ঠিক বুঝি না, এই ধরণের পিত্তিজ্বালানো কথা যা আমি এই শহরের অভিজাত শিক্ষাকেন্দ্রে শুনে শুনে অভ্যস্ত, এই মেয়েরা সেসব কখনোই উচ্চারণ করবে না। বরং সপনা খুব উত্তেজিতভাবে বলে, দুটো বাচ্চার দু প্যাকেট দুধ লাগে, তাতেই এখন বারো টাকা এক্সট্রা বার করতে হয় রোজ, ওষুধ ছাড়া আমাদের চলে না, আর জিএসটি বসিয়ে ওষুধের দাম বাড়িয়েছে কতো! 

    অর্থাৎ বুনিয়াদি অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধান চায় সোনাগাছি। আর সেসব ভুলিয়ে দেবার জন্য নামানো হয় এনআরসি, সিএএ-র খাঁড়া। বধ্যভূমিতে রক্তের গন্ধের মধ্যে দাঁড়িয়ে এখনো সোনাগাছির শিরদাঁড়া ঋজু। তবে তা কতোকালের জন্য কেউ জানে না! আপাতত ঠিক আছে মেয়েরা কাগজ কেউ দেখাবে না -   দুধ চাহে তো ক্ষীর দেঙ্গে / কাগজ চাহে তো চির দেঙ্গে!

     

     

     
     



    Tags
     


    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>

     



    তথ্য নীতি | Privacy policy

 
Website © and ® by Ebong Alap / এবং আলাপ, 2013-24 | PRIVACY POLICY
Web design & development: Pixel Poetics