• মেয়েরা কি বিজ্ঞান পড়ে?


    0    125

    November 29, 2019

     

    মৈত্রেয়ী এবং শুভায়ন মিত্র। দুজনেই ইস্কুলে পড়ান। দু’জনেরই বিষয় জীবন বিজ্ঞান। মৈত্রেয়ী’র ইস্কুল হুগলি জেলার মশাট গ্রামে। স্কুলের নাম হরিপুর দুর্গাপদ মেমোরিয়াল হাই স্কুল। শুভায়ন খলিশনি বিদ্যামন্দিরের প্রধান শিক্ষক। স্কুলের গন্ডিতে এবং বিজ্ঞানের ক্লাসে লিঙ্গবৈষম্য প্রসঙ্গে তাঁদের সাথে কথোপকথনে উঠে এসেছে প্রচলিত ধ্যানধারণা-র নিরিখে এই মুহুর্তের পরিস্থিতি, কিছু প্রবণতা এবং সম্ভাবনার কথা।

     

    ছেলেরা আর্টস পড়ে না। মেয়েরা সায়েন্স পড়ে না...

    "

    এখন আমি যে ইস্কুলে পড়াই সেখানে

    ছেলেদের সংখ্যা কম সায়েন্সে, মেয়েদের সংখ্যাই বেশি।

    "

    শুভায়ন – এখন কিন্তু পরিস্থিতি পাল্টেছে। তার কারণ এখন তো আর্টস, সায়েন্স, কমার্স বলে কিছু নেই। এখন সায়েন্স আর আর্টস-এর বিষয় একসাথে পড়া যায়। যে ভূগোল পড়ে সে তার সঙ্গে বায়োলজিও পড়তে পারে।

    মৈত্রেয়ী – সরকার কিছু কিছু বিষয়কে ক্লাব করেছে। তার মধ্যে থেকে বিষয় নির্বাচন করতে হয়।

    শুভায়ন – কিন্তু এটার একটা পরিকাঠামোগত সমস্যা আছে। ইস্কুলে সব সময় ক্লাস দেওয়া যায় না। সায়েন্স আর আর্টস-এর বিষয় একসাথে রুটিন করা কঠিন। এই সমস্যাগুলো স্কুলে থাকার জন্য বিষয় নির্বাচনে কিছু বাধা থাকে। হয়তো এই ইস্কুলে পাচ্ছে না। অন্য কোথাও গেলে পাবে।

    মৈত্রেয়ী – ক্লাব হওয়ার কারণে অপ্‌শান অনেক বেড়ে গেছে। আমি একটা কো-এড স্কুলে পড়াই। এখন আর ওই মাধ্যমিকের পর ছেলেরা সায়েন্স নেবে আর মেয়েরা সায়েন্স নেবে না, এই ব্যাপারটা একদমই চলে গেছে। এমনকী এখন আমি যে ইস্কুলে পড়াই সেখানে ছেলেদের সংখ্যা কম সায়েন্সে, মেয়েদের সংখ্যাই বেশি।

     

    বিজ্ঞানের বই, বিজ্ঞানের ক্লাস

    "

    প্রথমেই ক্লাসে গিয়ে বলতাম যে

    এগুলো তো মানুষের কথা, এগুলো আমাদের সবার মধ্যে আছে,

    লিঙ্গের কারণে কিছু জিনিস আলাদা হতে পারে,

    কিন্তু পুরোটাই স্বাভাবিক, এতে লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই।

    "

    মৈত্রেয়ী – ক্লাস টেন অব্দি তো আমরা মানুষের শরীর ইত্যাদি অত খুঁটিনাটি পড়াই না। কিন্তু ইলেভেন টুয়েলভে সেটা আছে। সিলেবাস এখন অনেক পাল্টে গেছে। মেয়েদের পিরিয়ড্‌স হওয়া, প্রজনন...

    শুভায়ন – যৌন রোগ ইত্যাদি বিষয়গুলো সিলেবাসে আছে।  

    মৈত্রেয়ী – ইলেভেন টুয়েল্‌ভের সিলেবাস খুব ভালো। ছেলেমেয়েদের মধ্যে এই ব্যাপারটা যদি আরও আগে থেকে তৈরি করা যায় তাহলে ধারণাগুলো আরও আগে থেকে ভাঙা সম্ভব। কারিকুলামের মধ্যে অষ্টম বা নবম শ্রেণির বইতে এখন যদি এরকম উদাহরণ থাকে যে বয়ঃসন্ধির সময়ে একটি মেয়ের গালে ব্রণ বেরোচ্ছে, তাহলে তার পরেই আরেকটা উদাহরণ থাকে যে একটি ছেলের দাড়ি গজাচ্ছে। এগুলো এখন এসে গেছে। এর ফলে পড়াতেও অনেক সুবিধে হচ্ছে। আর যে ক্লাসে ছেলে মেয়েরা পাশাপাশি বসে আছে, সেখানে এসব বললে হয়তো একটু মুচকি মুচকি হাসছে, এর ওর দিকে তাকাচ্ছে কিন্তু আস্তে আস্তে বুঝতে পারছে। আমি নতুন সিলেবাসের প্রথম যে ক্লাসটা পড়াই, সেটা পড়াতে গিয়ে আমি বুঝতে পারি যে ওদের সাথে বন্ধুর মত করে না মিশলে এই বিষয়গুলো পড়ানো সম্ভব হবে না। আমি প্রথমেই ক্লাসে গিয়ে বলতাম যে এগুলো তো মানুষের কথা, এগুলো আমাদের সবার মধ্যে আছে, লিঙ্গের কারণে কিছু জিনিস আলাদা হতে পারে, কিন্তু পুরোটাই স্বাভাবিক, এতে লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই। তাতে দেখলাম যে আস্তে আস্তে কিন্তু ওরাও স্বাভাবিক ভাবে ব্যাপারটা নিতে পারছে। ক্লাস টেন অব্দি যে ছেলেরা আর মেয়েরা ক্লাসে পাশাপাশি বসত না, ইলেভেন টুয়েলভে কিন্তু সেটা ভেঙে যাচ্ছে।

    শুভায়ন – গত চার-পাঁচ বছরে সিলেবাসটা এভাবে পাল্টেছে। কিন্তু সমাজব্যবস্থা তো পাল্টায়নি। বাড়িতে যা প্রভাব, সমাজের যা প্রভাব, সেটা তো ইস্কুলেও থাকবে।

    আর একটা জিনিস হচ্ছে যে ক্লাস টেন অব্দি ল্যাব-এর কোনও ব্যবস্থা থাকে না। ইলেভেন টুয়েল্‌ভে থাকে। এটা আমাদের একটা ব্যর্থতা যে বিজ্ঞানের বিষয়গুলো পড়ার ক্ষেত্রে প্রথম থেকে ল্যাব-কে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। যেমন, ক্লাস নাইনে যখন টাইট্রেশান পড়ানো হচ্ছে তখন যদি একটু অ্যাসিড টেস্ট করে দেখানো যায়, বা ক্লাস এইট-এ যখন কোষ পড়ছে তখন যদি একটা মাইক্রোস্কোপ এনে সেটা দেখানো যায়, তাহলে খুবই ভালো হয়। ওরাও কিন্তু খুব উৎসাহ পায়। কিন্তু সেটা সব সময় সম্ভব হয় না।  

    মৈত্রেয়ী – আসলে অনেক ইস্কুলে ইলেভেন টুয়েলভে বিজ্ঞান থাকে না, তাই তাদের ল্যাব-এর ব্যবস্থাই থাকে না। ক্লাস এইট, নাইন, টেন-এ প্রজেক্ট থাকে। সেগুলোর বিষয় সমাজের নানান সমস্যা থেকেই উঠে আসে। যেমন আমি এ বছর ক্লাস টেনে প্রজেক্ট করতে দিয়েছি তামাক সেবনের কুফল নিয়ে চারপাশে ওরা যা দেখছে। সেটা ওরা মিডিয়া থেকে যা জানছে তা নিয়ে চার্ট বানাতে পারে, কোলাজ করতে পারে।

    শুভায়ন – বা দশটা পরিবারে গিয়ে সার্ভে করতে পারে। তবে একটা মুশকিল হল যে একশো জনের ক্লাসে দশ জন কাজটা করে, বাকিরা টোকে।

    মৈত্রেয়ী – আবার সবাই যদি আলাদা আলাদা কাজ করে তাহলেও আমাদের মুশকিল! এত কাজ দেখব কী করে?

    একসাথে – সার্ভে করতে ওরা ভালোবাসে।

    মৈত্রেয়ী – বেশির ভাগ ক্ষেত্রে স্কুলের ছুটির পর সার্ভে হয়।

    শুভায়ন – কোনও ছুটিতে সার্ভে হতে পারে। আবার অনেক সময় শিক্ষকের সাহায্য নিয়ে স্কুলের সময়ের মধ্যেই সার্ভে হয়। যেরকম আমি একটা কাজ করিয়েছিলাম ওদের – বাড়িতে মা ঠাকুমাদের জিজ্ঞেস করে কী কী রকমের দেশি ওষুধ ব্যবহার করা হয়, মানে কেটে গেলে কী পাতা লাগানো হয় ইত্যাদি, যাকে আমরা এথ্‌নো বটানি বলে থাকি, সেই বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা। অনেক অজানা তথ্য আমরা জানতে পারি।

    মৈত্রেয়ী – আমি গত বছর ছাত্র ছাত্রীদের নিয়ে গেছিলাম একটা জুনিয়র সায়েন্স কংগ্রেসে। নিম পাতার সঙ্গে নিশিন্দা গাছের পাতা মিশিয়ে আমার ল্যাবে আমরা একটা মশা মারার ওষুধ তৈরি করে ফেলি। এবার সেটা খুব সস্তা হবে, ওরা সহজে তৈরি করতে পারবে। ওরা প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে রাজ্যস্তর অব্দি পৌঁছেছিল। খুব উৎসাহের সঙ্গে কলকাতা এসেছিল। একেকটা স্তর পার করে এসেছিল বলে কনফিডেন্সও তৈরি হয়েছিল।

    শুভায়ন – এখন সরকারি অথবা আধা সরকারি সংস্থাগুলোতে এরকম অনেক সুযোগ থাকে। তবে সার্ভেতে মেয়েদের অংশগ্রহণ নিয়ে কিছু সমস্যা থাকে। তার একটা কারণ সুরক্ষা। মা-বাবা চান স্কুলের সময়ের মধ্যেই হোক।

    মৈত্রেয়ী – এবং সেটা শিক্ষকের উপস্থিতিতে হোক। দশ জন ছেলেকে আমি সার্ভের কাজে ছেড়ে দিলে কেউ  কিছু বলবে না। কিন্তু মেয়েদের ছাড়লে সমাজ থেকেই এই প্রশ্নটা উঠে আসবে যে আমি কেন ছাড়লাম।

    শুভায়ন – ছেলে আর মেয়েদের আলাদা দল হয়। যদি একসাথে এরা কাজ করে, তাহলে কিন্তু স্কুলের বাইরের অনেকে, গ্রামের লোকজন এসে নালিশ জানান। শিক্ষকরাও অনেকে ব্যাপারটা ভালো চোখে দেখেন না।

    মৈত্রেয়ী – গ্রামের মানসিকতাটাই এটা নয়। আমরা চেষ্টা করে দেখেছি, কিন্তু করতে গিয়ে বাধা পেয়েছি।

    শুভায়ন – গ্রামের মানসিকতার সঙ্গেও কিছুটা মানিয়ে তো চলতেই হয়। কোন গ্রাম সেটাও ভাবতে হবে। পুরুলিয়া-বাঁকুড়ার গ্রাম, সুন্দরবনের গ্রাম আর উত্তরবঙ্গের গ্রাম কিন্তু একরকম নয়। পশ্চিমবঙ্গের এই বৈচিত্র্য আমি দেখেছি। আমার শহর-ঘেঁষা গ্রামের স্কুলে ছেলে-মেয়েরা একসাথে কাজ করে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অসুবিধে হয় না। কিন্তু ওদের স্কুল প্রত্যন্ত গ্রামে। সেখানে এই অসুবিধেটা আছে। আমি নিজে গ্রামে চাকরি করে এসেছি আরামবাগের থেকে আরও ১০ কিলোমিটার ভেতরে। সেখানে এই সমস্যাটা ছিল। কিন্তু সেখান থেকেও ছেলে মেয়েরা আরও লেখাপড়া করে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। ওখানে মেয়েদের ‘মেয়েছেলে’ বলে ডাকা হত। মাস্টাররাই ডাকতেন।

    মৈত্রেয়ী – এটা আমাদের স্কুলেও আছে। অনেক বলেও এটা বন্ধ করা যায়নি।

    শুভায়ন – সিলেবাসের ক্ষেত্রে আরেকটা কথা আমার বলার আছে, যদিও বিজ্ঞানের কথা নয়, সেটা বাংলা নিয়ে। আমি দেখলাম যে যদি তিরিশটা লেখা থেকে থাকে, তাহলে তার মধ্যে আঠাশটি লেখা পুরুষদের, দু’টি মেয়েদের। বিজ্ঞানের সিলেবাস এখন বেশ কার্যকরী। তবে একটা সমস্যা হচ্ছে যে সব ছাত্র-ছাত্রী, বিশেষ করে বিজ্ঞানের সিলেবাস, সবটা বুঝতে পারে না। সর্বভারতীয় স্তরে সার্ভে করে কিন্তু দেখা গেছে যে পশ্চিমবঙ্গের ছাত্রছাত্রীদের অবস্থা বেশ খারাপ। সিলেবাস ভালো হলেও নেওয়ার এবং দেওয়ার লোকের অভাব রয়েছে।

    মৈত্রেয়ী – আগে আমরা যেমন পড়তাম সংজ্ঞা তারপর সেটার ব্যাখ্যা। সেটা পালটে এখন অনেক গল্পের মধ্যে দিয়ে বোঝানো হয়।

    শুভায়ন – এটা আধুনিক প্রক্রিয়া। আগে ক্যাপাসিটি তৈরি করা, তারপর কনসেপ্ট।

    মৈত্রেয়ী – হরমোন পড়াতে গিয়ে যেমন আগে বলা হয় যে নিজেরা দেখো তোমাদের কী কী পরিবর্তন হচ্ছে। তারপরের ধাপে জানবে সেগুলো কেন হচ্ছে। তারপর জানবে যে এগুলো ঠিকমত না হলে কী কী হতে পারে।

    শুভায়ন – আমি কী ফিল্‌ করছি, কী ভাবে ফিল্‌ করছি, তারপর প্রশ্ন কেন।

    মৈত্রেয়ী – বিজ্ঞান মানে আসলে জীবন। চারপাশটাকে জানা। এইটা আছে ক্লাস এইট অব্দি। নাইন টেন-এ সেই পুরনো ছাঁদের সিলেবাসই আছে।

     

    বিজ্ঞান মানে জীবন

    "

    মা-বাবা’র থেকে শিক্ষকরা কিন্তু অনেক সময় ছেলে-মেয়েদের মনের বেশি খবর রাখেন।

    "

    মৈত্রেয়ী – আমরা ছোট ছোট দলে ভাগ করে পিরিয়ড্‌স নিয়ে মেয়েদের সঙ্গে আলোচনা করি। কোনও সমস্যা হলে মেয়েরা কিন্তু ম্যাডামদের কাছেই আসতে চায়। স্যারদের কাছে না। আমাদের স্কুলে যারা পড়ে, তারা বেশির ভাগই ফার্স্ট জেনেরেশান লার্নার। তাদের মা-বাবা’র মধ্যে সচেতনতা তৈরির কাজ যদি আমাদের করতে হয়, তাহলে সেটা সময় সাপেক্ষ এবং বারবার তাঁদের স্কুলে আসতে হবে। আমরা চাই ছেলেমেয়েরাই বাড়িতে সচেতনতা তৈরি করুক।

    শুভায়ন – ওদের যেহেতু বয়স কম, তাই ওদের বোঝানো অনেক সহজ। আস্তে আস্তে ওরাও কিন্তু বাড়িতে গিয়ে এসব বলে।

    মৈত্রেয়ী – ভাইকে গোটা ডিম দেওয়া হয় বাড়িতে, বোনকে হয় না, আমরা বলি যে তোমরা গিয়ে এটা বাড়িতে বল যে এটা ঠিক নয়। কিন্তু বাস্তবে কী হয় জানি না।

    শুভায়ন – আমি প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব নেওয়ার পরে দেখেছি যে এমনটা নয় যে আমরা বাড়ির লোকের সঙ্গে কথা বলি না, কিন্তু অনেক সময় আমাদের কথা তাঁদের স্পর্শ করে না। আসলে শিকড় অনেক গভীরে প্রোথিত থাকলে তা তুলে ফেলা খুব কঠিন। তবে খুব আস্তে আস্তে এই অবস্থাটা পালটাচ্ছে।

    মৈত্রেয়ী – আরেকটা জিনিস আমার মনে হয় যে বাধ্যতামূলক ভাবে স্কুলে কাউন্সেলিং-এর ব্যবস্থা থাকা উচিত।

    শুভায়ন – বিশেষ করে বয়ঃসন্ধি’র সময়ে...

    মৈত্রেয়ী – হ্যাঁ। এই সময়ে ওদের অনেক প্রশ্ন থাকে। তার সবটা কিন্তু আমরা ক্লাসের সময়ে বুঝিয়ে বলতে পারি না। আমি চেষ্টা করি একটা জিনিস করতে, তবে সেটা বছরে এক-দু’বারের বেশি পারি না, সেটা হল একদিন এই বয়সী মেয়েদের নিয়ে বসলাম। অনেক কথা তাদের। এক দিনে ফুরোতে চায় না। আর একদিন ছেলেদের নিয়ে বসলাম।

    শুভায়ন – ছাত্রছাত্রীরাও কিন্তু অনেক কথা বলতে চায়।

    মৈত্রেয়ী – যদি বলাটা বাধ্যতামূলক হয়, তাহলে ওদের অনেক সুবিধে হবে। ওরা একটা বলার জায়গা পাবে।

    শুভায়ন – মা-বাবা’র থেকে শিক্ষকরা কিন্তু অনেক সময় ছেলে-মেয়েদের মনের বেশি খবর রাখেন।

    মৈত্রেয়ী – আমাদের স্কুলে যেরকম আগে মেয়েদের ঠিকমত বাথরুম ছিল না। শিক্ষিকাদের জন্যেও না। আর এখনো আমাদের আলাদা স্টাফরুম। মানে পুরুষরা একদিকে বসেন, মহিলারা আরেকদিকে – মাঝে পাঁচিল। ছাত্রীরা আগে খুব এসে বলত হাফ ডে দিয়ে দিতে, কারণ পেটে খুব ব্যথা করছে। ছুটি নিয়ে বাড়ি চলে যেত। আমি যখন সদ্য চাকরি করতে শুরু করেছি, তখন এরকম খুব দেখতাম। আমি একটা উপায় বের করলাম। হেডমাস্টারের থেকে কিছু টাকা নিয়ে একটা স্যানিটারি ন্যাপকিনের বাক্স বানালাম। এক টাকার বিনিময়ে ছাত্রীরা সেখান থেকে ন্যাপকিন নিতে পারত। এতে করে হাফ ডে নেওয়া কিছুটা কমল। অনেকে আবার পেটের ব্যাথার কথা বানিয়ে বানিয়ে বলত। একবার তো একটা মেয়ে পেটে ব্যাথা বলে ছুটি নিয়ে পালিয়ে বিয়ে করতে চলে গেছিল! এই মিথ্যে বলা বন্ধ করার জন্য একটা ভুঁয়ো ওষুধের বাক্স বানালাম। ওষুধ খাওয়ার আর ইঞ্জেক্‌শান নেওয়ার ভয়ে ওদের মিথ্যে কথা বলা কমে গেল।

    শুভায়ন – আমি স্কুলে মেয়েদের জন্য একটা চেঞ্জিং রুমের ব্যবস্থা করেছি। আমি খেয়াল করে দেখেছি যে কখনো বৃষ্টিতে ভিজে ইস্কুলে এলে মেয়েরা ভেজা জামাতে থাকতে বেশি অস্বস্তি বোধ করে। তাই ওদের জন্য এই ঘরটার ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছে।

     

    বিজ্ঞান পড়ে কী করব?

    "

    আমার ইস্কুলে যে মেয়েরা বায়োলজি নিয়ে পড়ে,

    তারা যে ভবিষ্যতে ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন দেখে এমনটা নয়।

    "

    শুভায়ন – আমি খেয়াল করে দেখেছি যে বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে, বা সাধারণভাবে লেখাপড়ার ক্ষেত্রেও মেয়েরা কিন্তু এখন ছেলেদের থেকে এগিয়ে আছে। আমাদের স্কুলে উচ্চমাধ্যমিকে বিজ্ঞান শাখা নেই। কিন্তু সম্প্রতি দু’জন বিজ্ঞান বিভাগে চাকরি পেয়েছেন – দু’জনেই মহিলা।

    মৈত্রেয়ী – আমার ইস্কুলে যে মেয়েরা বায়োলজি নিয়ে পড়ে, তারা যে ভবিষ্যতে ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন দেখে এমনটা নয়। তারা অনেকেই নার্সের ট্রেনিং নেয়। এতে করে তারা সহজে চাকরি পেতে পারে আর নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে। কয়েকজন কলেজেও পড়ে। আমার এক ছাত্রী বি এস সি পাশ করে এখন আমার সঙ্গেই পার্ট টাইম পড়ায়। এটা আমার কাছেও যেমন খুব গর্বের বিষয়, ওর কাছেও খুব আনন্দের।

    জীবন বিজ্ঞান শব্দবন্ধের মধ্যেই এর অন্য এক অর্থ লুকিয়ে রয়েছে। শুভায়ন এবং মৈত্রেয়ী তাঁদের পড়ানোর মধ্যে দিয়ে এই অন্য অর্থকেই সামনে নিয়ে আসার চেষ্টা করেন। তাঁরা দুজনেই জানিয়েছেন যে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের মধ্যে লিঙ্গ বিষয়ক সচেতনতা বৃদ্ধির ট্রেনিং প্রয়োজন। তাঁদের ট্রেনিং না থাকলে তাঁরা ছাত্র-ছাত্রীদের মন থেকে এই জাতীয় ধ্যানধারণা দূর করবেন কী করে? তবে তাঁদের আশা, আস্তে আস্তে ছাত্র ছাত্রীদের মধ্যে দিয়েই পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব।

    [ সাক্ষাৎকার এবং অনুলিখন: সর্বজয়া ভট্টাচার্য]

     
     



    Tags
     


    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>

     



    তথ্য নীতি | Privacy policy

 
Website © and ® by Ebong Alap / এবং আলাপ, 2013-24 | PRIVACY POLICY
Web design & development: Pixel Poetics